০৩:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে পাঁচ মাসের শুঁটকি মৌসুম শুরু, ১০ হাজার জেলের কর্মচাঞ্চল্য; দস্যু আতঙ্ক ও ঋণের বোঝার দুশ্চিন্তা

বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সুন্দরবনের দুবলার চরকেন্দ্রিক চারটি অস্থায়ী জেলে পল্লি—আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলারচরে শুরু হয়েছে শুঁটকি আহরণ মৌসুম। গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে টানা পাঁচ মাস। দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এসব জেলে পল্লি থেকে। এবার মৌসুমে সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ।

মৌসুমকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জেলে ও মহাজনরা ইতোমধ্যে সুন্দরবনে আসতে শুরু করেছেন। সাগরে মাছ আহরণ করে রোদে শুকিয়ে কোরাল, লাক্ষা, রূপচাঁদা, লইট্টা, ছুরি ও চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ থেকে তৈরি হবে সুস্বাদু শুঁটকি। পরে এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হবে।

তবে নতুন মৌসুমের শুরুতেই জেলে ও মহাজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দস্যু আতঙ্ক, বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি এবং ঋণের বোঝা। গত মৌসুমে দস্যুদের চাঁদাবাজি, জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। মাছ ধরতে না পারা এবং বৃষ্টিতে শুঁটকি নষ্ট হওয়ায় অনেকেই বিনিয়োগের অর্থও তুলতে পারেননি।

পুরোনো লোকসান ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই এবার নতুন করে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন তাঁরা। দুবলার চরে মহাজনদের জন্য তৈরি হচ্ছে ৬৬টি অস্থায়ী ডিপোঘর। ১০ হাজারের বেশি জেলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ১ হাজার ৮টি জেলেঘর। এ ছাড়া জেলেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে থাকবে ১১৬টি অস্থায়ী দোকান।

আলোরকোল শুঁটকি পল্লির রামপাল জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মহাজন জাকির শেখ জানান, গত মৌসুমে দস্যুদের তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে তাঁকে। সব মিলিয়ে লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এরপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবার ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সুন্দরবনে এসেছেন তিনি।

তিনি জানান, তাঁর সমিতিতে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী রয়েছেন। গত মৌসুমে তাঁদের অধিকাংশই লোকসানে পড়েছেন। অনেককে দস্যুদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরতে না পারায় ব্যবসায়িক ক্ষতি আরও বেড়েছে। এবারও লোকসান হলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

একই চিত্র অন্য ব্যবসায়ীদেরও। শুঁটকি ব্যবসায়ী মোয়াজ্জেম শেখ গত মৌসুমে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ১০ লাখ টাকা লোকসান করেছেন। এবার নতুন করে ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন। তায়েব আলী শেখ ও মাসুম শেখের প্রত্যেকের গত মৌসুমে লোকসান হয়েছে ২০ লাখ টাকা করে। এবার তাঁরা নতুন করে ৩৫ লাখ টাকা করে ঋণ নিয়েছেন। এনামুল হক ৪০ লাখ এবং জিয়া শেখ ৪৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করেছেন।

সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকার আলোরকোল চাকলা মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রউফ মেম্বর জানান, তাঁদের সমিতির তিন শতাধিক বহদ্দারের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। গত মৌসুমে তাঁর নিজের ১২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। জেলে ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে ১১ কাঠা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। এবার ব্যাংক থেকে ১২ লাখ এবং সুদে আরও ৮ লাখ টাকা নিয়ে মোট ২০ লাখ টাকা পুঁজি সংগ্রহ করেছেন।

সমিতির সদস্য মোবারক সানার ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। দেনা পরিশোধ করতে না পেরে ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ শেখ জাল-নৌকা বিক্রির পাশাপাশি এক বিঘা জমিও বিক্রি করেছেন। একইভাবে ঋণের চাপে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন সমিতির ১৭ জন ব্যবসায়ী।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত মৌসুমে দস্যুরা প্রতিটি নৌকা ও ট্রলারের বিপরীতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। ফলে ছোট ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ লাখ এবং বড় ব্যবসায়ীদের ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে।

দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রায় ১০০ বছর ধরে সুন্দরবনের দুবলার চারটি চরে শুঁটকি উৎপাদন হয়ে আসছে। দেশ-বিদেশে এখানকার শুঁটকির বিশেষ সুনাম রয়েছে। এ পেশার সঙ্গে ১০ হাজারের বেশি জেলের জীবন-জীবিকা জড়িত। পাশাপাশি মাছ পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, নৌযান ও জাল মেরামত, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে আরও কয়েক হাজার মানুষ যুক্ত।

তিনি বলেন, দস্যুদের তৎপরতায় শুঁটকি ব্যবসা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মৌসুমের শুরু থেকেই দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। রাতেও কোস্টগার্ডের সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে অনেক ব্যবসায়ীই এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।

এদিকে, সুন্দরবনের প্রায় শত বছরের শুঁটকি পল্লিতে এবার প্রথমবারের মতো জেলে ও মহাজনদের চিকিৎসাসেবা দিতে সার্বক্ষণিক ভাসমান ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের উদ্যোগে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবন বিভাগ জানায়, গত মৌসুমে দুবলার চর থেকে ৭ হাজার ৯৬০ দশমিক ২৭৬৬ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এ খাত থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদন এবং ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলেঘর, ডিপোঘর ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরিতে সুন্দরবনের কোনো বনজ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। তাই প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিজ নিজ এলাকা থেকে নিয়ে আসছেন জেলে ও মহাজনরা।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দস্যুতা দমনে বন বিভাগ, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। জেলেরা যাতে রাতেও নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, দুবলার চারটি চরে শুঁটকি মৌসুম ঘিরে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কোস্টগার্ডের জাহাজ, বোট ও বিশেষ টহল দল সুন্দরবনের চারটি শুঁটকি পল্লি, বঙ্গোপসাগর, আশপাশের নদী ও চ্যানেলে সার্বক্ষণিক টহল দেবে।

তিনি আরও জানান, বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণ প্রতিরোধ এবং জেলে-মহাজনদের নিরাপদে মাছ আহরণ ও ব্যবসা পরিচালনায় কোস্টগার্ড সক্রিয় রয়েছে। যেকোনো দস্যুতার ঘটনা বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় দ্রুত সহায়তা পেতে কোস্টগার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগের জন্য জেলে ও মহাজনদের অনুরোধ করা হয়েছে।

নতুন মৌসুমে জেলে-মহাজনদের প্রত্যাশা, দস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং বৈরী আবহাওয়ার বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হলে এবার কাঙ্ক্ষিত শুঁটকি উৎপাদনের পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পরিশোধ করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন তাঁরা।

Tag:
জনপ্রিয়

মধ্যরাত থেকে শুরু ৮ মাসের জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞা, আইন অমান্যে ২ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা

সুন্দরবনে পাঁচ মাসের শুঁটকি মৌসুম শুরু, ১০ হাজার জেলের কর্মচাঞ্চল্য; দস্যু আতঙ্ক ও ঋণের বোঝার দুশ্চিন্তা

আপডেট সময়: ০৬:৫১:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী সুন্দরবনের দুবলার চরকেন্দ্রিক চারটি অস্থায়ী জেলে পল্লি—আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলারচরে শুরু হয়েছে শুঁটকি আহরণ মৌসুম। গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে টানা পাঁচ মাস। দেশের মোট শুঁটকি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে এসব জেলে পল্লি থেকে। এবার মৌসুমে সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ।

মৌসুমকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জেলে ও মহাজনরা ইতোমধ্যে সুন্দরবনে আসতে শুরু করেছেন। সাগরে মাছ আহরণ করে রোদে শুকিয়ে কোরাল, লাক্ষা, রূপচাঁদা, লইট্টা, ছুরি ও চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ থেকে তৈরি হবে সুস্বাদু শুঁটকি। পরে এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হবে।

তবে নতুন মৌসুমের শুরুতেই জেলে ও মহাজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দস্যু আতঙ্ক, বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি এবং ঋণের বোঝা। গত মৌসুমে দস্যুদের চাঁদাবাজি, জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। মাছ ধরতে না পারা এবং বৃষ্টিতে শুঁটকি নষ্ট হওয়ায় অনেকেই বিনিয়োগের অর্থও তুলতে পারেননি।

পুরোনো লোকসান ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই এবার নতুন করে লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন তাঁরা। দুবলার চরে মহাজনদের জন্য তৈরি হচ্ছে ৬৬টি অস্থায়ী ডিপোঘর। ১০ হাজারের বেশি জেলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ১ হাজার ৮টি জেলেঘর। এ ছাড়া জেলেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে থাকবে ১১৬টি অস্থায়ী দোকান।

আলোরকোল শুঁটকি পল্লির রামপাল জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মহাজন জাকির শেখ জানান, গত মৌসুমে দস্যুদের তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে তাঁকে। সব মিলিয়ে লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এরপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবার ৪০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সুন্দরবনে এসেছেন তিনি।

তিনি জানান, তাঁর সমিতিতে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী রয়েছেন। গত মৌসুমে তাঁদের অধিকাংশই লোকসানে পড়েছেন। অনেককে দস্যুদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরতে না পারায় ব্যবসায়িক ক্ষতি আরও বেড়েছে। এবারও লোকসান হলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

একই চিত্র অন্য ব্যবসায়ীদেরও। শুঁটকি ব্যবসায়ী মোয়াজ্জেম শেখ গত মৌসুমে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে ১০ লাখ টাকা লোকসান করেছেন। এবার নতুন করে ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন। তায়েব আলী শেখ ও মাসুম শেখের প্রত্যেকের গত মৌসুমে লোকসান হয়েছে ২০ লাখ টাকা করে। এবার তাঁরা নতুন করে ৩৫ লাখ টাকা করে ঋণ নিয়েছেন। এনামুল হক ৪০ লাখ এবং জিয়া শেখ ৪৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করেছেন।

সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকার আলোরকোল চাকলা মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রউফ মেম্বর জানান, তাঁদের সমিতির তিন শতাধিক বহদ্দারের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই ঋণগ্রস্ত। গত মৌসুমে তাঁর নিজের ১২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। জেলে ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে ১১ কাঠা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। এবার ব্যাংক থেকে ১২ লাখ এবং সুদে আরও ৮ লাখ টাকা নিয়ে মোট ২০ লাখ টাকা পুঁজি সংগ্রহ করেছেন।

সমিতির সদস্য মোবারক সানার ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। দেনা পরিশোধ করতে না পেরে ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ শেখ জাল-নৌকা বিক্রির পাশাপাশি এক বিঘা জমিও বিক্রি করেছেন। একইভাবে ঋণের চাপে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন সমিতির ১৭ জন ব্যবসায়ী।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত মৌসুমে দস্যুরা প্রতিটি নৌকা ও ট্রলারের বিপরীতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। ফলে ছোট ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ লাখ এবং বড় ব্যবসায়ীদের ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে।

দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রায় ১০০ বছর ধরে সুন্দরবনের দুবলার চারটি চরে শুঁটকি উৎপাদন হয়ে আসছে। দেশ-বিদেশে এখানকার শুঁটকির বিশেষ সুনাম রয়েছে। এ পেশার সঙ্গে ১০ হাজারের বেশি জেলের জীবন-জীবিকা জড়িত। পাশাপাশি মাছ পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, নৌযান ও জাল মেরামত, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে আরও কয়েক হাজার মানুষ যুক্ত।

তিনি বলেন, দস্যুদের তৎপরতায় শুঁটকি ব্যবসা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মৌসুমের শুরু থেকেই দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। রাতেও কোস্টগার্ডের সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে অনেক ব্যবসায়ীই এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।

এদিকে, সুন্দরবনের প্রায় শত বছরের শুঁটকি পল্লিতে এবার প্রথমবারের মতো জেলে ও মহাজনদের চিকিৎসাসেবা দিতে সার্বক্ষণিক ভাসমান ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের উদ্যোগে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবন বিভাগ জানায়, গত মৌসুমে দুবলার চর থেকে ৭ হাজার ৯৬০ দশমিক ২৭৬৬ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এ খাত থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদন এবং ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলেঘর, ডিপোঘর ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরিতে সুন্দরবনের কোনো বনজ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। তাই প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিজ নিজ এলাকা থেকে নিয়ে আসছেন জেলে ও মহাজনরা।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দস্যুতা দমনে বন বিভাগ, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। জেলেরা যাতে রাতেও নির্বিঘ্নে মাছ আহরণ করতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, দুবলার চারটি চরে শুঁটকি মৌসুম ঘিরে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কোস্টগার্ডের জাহাজ, বোট ও বিশেষ টহল দল সুন্দরবনের চারটি শুঁটকি পল্লি, বঙ্গোপসাগর, আশপাশের নদী ও চ্যানেলে সার্বক্ষণিক টহল দেবে।

তিনি আরও জানান, বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণ প্রতিরোধ এবং জেলে-মহাজনদের নিরাপদে মাছ আহরণ ও ব্যবসা পরিচালনায় কোস্টগার্ড সক্রিয় রয়েছে। যেকোনো দস্যুতার ঘটনা বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় দ্রুত সহায়তা পেতে কোস্টগার্ডের জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগের জন্য জেলে ও মহাজনদের অনুরোধ করা হয়েছে।

নতুন মৌসুমে জেলে-মহাজনদের প্রত্যাশা, দস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং বৈরী আবহাওয়ার বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হলে এবার কাঙ্ক্ষিত শুঁটকি উৎপাদনের পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পরিশোধ করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন তাঁরা।