পটুয়াখালীর বাউফল নার্সিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে। ১৭টি বিষয়ে পাঠদানের বিপরীতে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস, ব্যবহারিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
শুধু শিক্ষক সংকটই নয়, প্রতিষ্ঠানটিতে নেই প্রয়োজনীয় নৈশপ্রহরী, পিয়ন ও বাবুর্চি। ফলে একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসিক জীবনেও তৈরি হচ্ছে নানা ভোগান্তি। প্রয়োজনীয় ল্যাব, শিক্ষা উপকরণ, শ্রেণিকক্ষ ও আসবাবপত্রের ঘাটতিও রয়েছে। সব মিলিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাউফল নার্সিং ইনস্টিটিউট। ২০২৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। কিন্তু ১৭টি বিষয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। ফলে এতসংখ্যক শিক্ষার্থীর নিয়মিত পাঠদান, ব্যবহারিক ক্লাস ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও প্রকট। সংশ্লিষ্টদের মতে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, সাতটি আধুনিক ল্যাব, অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, রান্নাঘর এবং পর্যাপ্ত শৌচাগার প্রয়োজন। এ ছাড়া নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সড়ক পাকাকরণ, মূল ফটক সংস্কার ও শহীদ মিনার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আসবাবপত্র এবং খেলাধুলার সরঞ্জামেরও ঘাটতি রয়েছে।
নার্সিং শিক্ষা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর নয়; এর বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন। এ ক্ষেত্রে আধুনিক ল্যাব, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকের বিকল্প নেই। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও জনবলের অভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণ এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠান প্রধান মরিয়ম বেগম জানান, শিক্ষক সংকট নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটিতে একজন নৈশপ্রহরীও নেই। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রতিনিয়ত নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে তাঁকে ব্যক্তিগত তহবিল থেকেও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এতে তাঁর পারিবারিক জীবনেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
এতসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ফলাফলে রয়েছে আশাব্যঞ্জক সাফল্য। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির ৭১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৩ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের এমন ফলাফল প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে।
তবে শিক্ষা কার্যক্রম ও ক্যাম্পাসের দৈনন্দিন পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুরাইয়া ও সোনিয়া আক্তার জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পাঠদান পাওয়া যাচ্ছে না। নৈশপ্রহরী ও পিয়ন না থাকায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বাবুর্চি না থাকায় নিজেদের রান্নার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হয়। এমনকি ক্যাম্পাসের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও তাঁদের করতে হচ্ছে।
তাঁরা আরও জানান, পর্যাপ্ত আসবাবপত্রের অভাব রয়েছে। খেলাধুলার জন্য একটি ক্যারম বোর্ডের মতো সাধারণ সরঞ্জামও নেই। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি আবাসিক জীবন পরিচালনা করাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তাঁরা।
সচেতন মহলের মতে, নার্সিং শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষার্থীদের দক্ষ ও যোগ্য নার্স হিসেবে গড়ে তুলতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ উপকরণ সরবরাহ এবং সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
এ অবস্থায় বাউফল নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষক সংকট নিরসন, প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, আধুনিক ল্যাব ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহল। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি তার শিক্ষার পরিবেশ ফিরে পাবে এবং শিক্ষার্থীরা মানসম্মত নার্সিং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।
মোঃ আরিফুল ইসলাম, বাউফল, পটুয়াখালী: 











