০৪:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মির্জাগঞ্জে একমাত্র জিপিএ-৫ প্রাপ্ত বাবাহারা আরাফাত; পোশাক শ্রমিক বোনের ত্যাগের পরও অনিশ্চিত উচ্চশিক্ষা

বাবাকে হারিয়ে যখন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল পড়াশোনা, তখন বড় বোনের আত্মত্যাগই হয়ে ওঠে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র অবলম্বন। পরিবারের অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সেই ভাই-ই এবার অর্জন করেছেন অভাবনীয় সাফল্য। এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৮৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন মো. আরাফাত খান। তিনি উপজেলার আখতার হোসেন চৌধুরী মেমোরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী।

তবে আরাফাতের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাঁর বড় বোন মোসা. রুবি আক্তারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ, শ্রম ও নিরলস সংগ্রাম। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। বোনের সেই আত্মত্যাগের ফলেই আজ সাফল্যের নতুন দিগন্তে দাঁড়িয়েছেন আরাফাত। এখন তাঁর স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আর্থিক সংকট সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরাফাত যখন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর বাবা মো. ইসমাইল খান মারা যান। বাবার মৃত্যুতে পাঁচ সদস্যের পরিবারটি হঠাৎ করেই চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে সবার জীবন। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় আরাফাতের পড়াশোনাও।

এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন আরাফাত। একপর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবতে শুরু করেন তিনি। ঠিক সেই সময় ছোট ভাইয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন বড় বোন রুবি আক্তার। সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি ভাইয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে শুরু করেন নতুন সংগ্রাম।

পরিবারের ভরণপোষণ ও ছোট ভাইয়ের শিক্ষার খরচ জোগাতে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন রুবি আক্তার। কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থে একদিকে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, অন্যদিকে নিশ্চিত করেছেন ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ। নিজের প্রয়োজন ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে দিনের পর দিন ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন তিনি।

বোনের এই ত্যাগের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে আরাফাত বলেন, “বাবার মৃত্যুর পর আমার জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছিল। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার বোন নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। একজন পোশাকশ্রমিক হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি যেভাবে আমাকে আগলে রেখেছেন, সেই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না। আমার এই সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি।”

এইচএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফলের পর আরাফাতের সামনে এখন উচ্চশিক্ষার নতুন স্বপ্ন। দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করতে চান তিনি। ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলারও স্বপ্ন দেখেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী।

তবে আর্থিক অসচ্ছলতা তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও ভর্তি, থাকা-খাওয়া, বইপত্রসহ পড়াশোনার আনুষঙ্গিক ব্যয় কীভাবে বহন করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে পরিবারটি। যে বোন নিজের জীবনের অনেক কিছু বিসর্জন দিয়ে তাঁকে এত দূর নিয়ে এসেছেন, তাঁর কষ্টের যথার্থ মূল্যায়ন করতে হলে আরাফাতের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করাও এখন পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা।

ছোট ভাইয়ের এমন সাফল্যে আনন্দিত ও গর্বিত বোন রুবি আক্তার বলেন, “সংসারের প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই আমাকে পোশাক কারখানায় কঠোর পরিশ্রমের কাজ বেছে নিতে হয়েছিল। তবে সব কষ্টের মধ্যেও আরাফাতের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ও জন্মগতভাবেই মেধাবী। ওর প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ই আজকের এই সাফল্য এনে দিয়েছে।”

মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৮৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনকারী আরাফাতের সামনে এখন উচ্চশিক্ষার নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর সেই সম্ভাবনা যেন থমকে না যায়, সে জন্য সমাজের বিত্তবান, দানশীল ও সহৃদয় ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কামনা করেছে তাঁর পরিবার।

পরিবারের প্রত্যাশা, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে আরাফাতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে পূর্ণতা পেতে পারে বড় বোন রুবি আক্তারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সংগ্রাম।

একজন ভাইয়ের সাফল্যের আড়ালে বোনের এমন নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও অদম্য স্বপ্নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

Tag:
জনপ্রিয়

খুলনার শিপইয়ার্ডে অস্ত্র ও গুলিসহ আশিক বাহিনীর কথিত শুটার জনি গ্রেফতার, উদ্ধার ওয়ান শুটারগান ও দুনলা বন্দুক

মির্জাগঞ্জে একমাত্র জিপিএ-৫ প্রাপ্ত বাবাহারা আরাফাত; পোশাক শ্রমিক বোনের ত্যাগের পরও অনিশ্চিত উচ্চশিক্ষা

আপডেট সময়: ০৩:৩৩:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

বাবাকে হারিয়ে যখন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল পড়াশোনা, তখন বড় বোনের আত্মত্যাগই হয়ে ওঠে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র অবলম্বন। পরিবারের অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সেই ভাই-ই এবার অর্জন করেছেন অভাবনীয় সাফল্য। এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৮৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন মো. আরাফাত খান। তিনি উপজেলার আখতার হোসেন চৌধুরী মেমোরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী।

তবে আরাফাতের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাঁর বড় বোন মোসা. রুবি আক্তারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ, শ্রম ও নিরলস সংগ্রাম। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। বোনের সেই আত্মত্যাগের ফলেই আজ সাফল্যের নতুন দিগন্তে দাঁড়িয়েছেন আরাফাত। এখন তাঁর স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আর্থিক সংকট সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরাফাত যখন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর বাবা মো. ইসমাইল খান মারা যান। বাবার মৃত্যুতে পাঁচ সদস্যের পরিবারটি হঠাৎ করেই চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে সবার জীবন। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় আরাফাতের পড়াশোনাও।

এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন আরাফাত। একপর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবতে শুরু করেন তিনি। ঠিক সেই সময় ছোট ভাইয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন বড় বোন রুবি আক্তার। সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি ভাইয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে শুরু করেন নতুন সংগ্রাম।

পরিবারের ভরণপোষণ ও ছোট ভাইয়ের শিক্ষার খরচ জোগাতে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন রুবি আক্তার। কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থে একদিকে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, অন্যদিকে নিশ্চিত করেছেন ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ। নিজের প্রয়োজন ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে দিনের পর দিন ভাইয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন তিনি।

বোনের এই ত্যাগের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে আরাফাত বলেন, “বাবার মৃত্যুর পর আমার জীবনে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছিল। পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার বোন নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। একজন পোশাকশ্রমিক হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি যেভাবে আমাকে আগলে রেখেছেন, সেই ঋণ কোনো দিন শোধ করতে পারব না। আমার এই সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি।”

এইচএসসি পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফলের পর আরাফাতের সামনে এখন উচ্চশিক্ষার নতুন স্বপ্ন। দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করতে চান তিনি। ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলারও স্বপ্ন দেখেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী।

তবে আর্থিক অসচ্ছলতা তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও ভর্তি, থাকা-খাওয়া, বইপত্রসহ পড়াশোনার আনুষঙ্গিক ব্যয় কীভাবে বহন করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে পরিবারটি। যে বোন নিজের জীবনের অনেক কিছু বিসর্জন দিয়ে তাঁকে এত দূর নিয়ে এসেছেন, তাঁর কষ্টের যথার্থ মূল্যায়ন করতে হলে আরাফাতের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করাও এখন পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা।

ছোট ভাইয়ের এমন সাফল্যে আনন্দিত ও গর্বিত বোন রুবি আক্তার বলেন, “সংসারের প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই আমাকে পোশাক কারখানায় কঠোর পরিশ্রমের কাজ বেছে নিতে হয়েছিল। তবে সব কষ্টের মধ্যেও আরাফাতের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ও জন্মগতভাবেই মেধাবী। ওর প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ই আজকের এই সাফল্য এনে দিয়েছে।”

মির্জাগঞ্জ উপজেলার ৮৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনকারী আরাফাতের সামনে এখন উচ্চশিক্ষার নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর সেই সম্ভাবনা যেন থমকে না যায়, সে জন্য সমাজের বিত্তবান, দানশীল ও সহৃদয় ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কামনা করেছে তাঁর পরিবার।

পরিবারের প্রত্যাশা, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে আরাফাতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে পূর্ণতা পেতে পারে বড় বোন রুবি আক্তারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সংগ্রাম।

একজন ভাইয়ের সাফল্যের আড়ালে বোনের এমন নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও অদম্য স্বপ্নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।