আজ ২৬ অক্টোবর, উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং কৃষক-প্রজার অধিকার আদায়ের অগ্রদূত শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৭৩ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কৃষক, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদানের জন্য ইতিহাসে তিনি ‘শেরে বাংলা’—অর্থাৎ বাংলার বাঘ—হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘হক সাহেব’ নামেও সুপরিচিত।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামটি বর্তমানে ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলায় অবস্থিত। তাঁর পিতা কাজী মুহাম্মদ ওয়াজেদ এবং মাতা সায়িদুন্নেছা খাতুন। শৈশব থেকেই মেধাবী ফজলুল হক পড়াশোনায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। পরবর্তী সময়ে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ধীরে ধীরে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী ও শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জমিদারি শোষণ, কৃষকের ঋণভার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। কৃষক-প্রজার স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৩৬ সালে তিনি কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কৃষকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন। ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের অধিবেশনে তিনি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে এই প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় কেবল গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, কৃষক-প্রজার অধিকার নিয়ে সোচ্চার অবস্থান এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দেয়। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের প্রতিনিধিত্বকারী এক আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তাঁর মৃত্যুর ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
বর্তমান সময়েও কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আলোচনায় তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
শেরে বাংলার জন্মবার্ষিকী শুধু একজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতাকে স্মরণ করার দিন নয়; এটি সাধারণ মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতির গুরুত্ব অনুধাবনেরও উপলক্ষ। তাঁর কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানতে এবং জনমানুষের কল্যাণে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়।
কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং উপমহাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।
মোঃ আল-মাহফুজ শাওন: 











