অভাবের সংসার, দিনমজুর বাবার অনিশ্চিত আয় আর পরিবারের অসুস্থ সদস্যের প্রতিকূলতা—সবকিছুই যেন একসঙ্গে ঘিরে ধরেছিল তাকে। তবু দারিদ্র্যের কাছে হার মানেননি মো. জাহিদুল ইসলাম। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ আর বাবার ঘামঝরা পরিশ্রমকে পুঁজি করে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় বাণিজ্য বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি। তবে ভালো ফলের আনন্দের মাঝেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ নিয়ে এখন গভীর দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।
জাহিদুল পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার খারিজ্জমা ডিগ্রি কলেজ থেকে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। তার বাবা মো. মিলন হাওলাদার পেশায় একজন দিনমজুর। সংসারে রয়েছেন মানসিক রোগে আক্রান্ত একজন সদস্য। দিনমজুরের কাজ সবসময় না থাকায় অনেক সময়ই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাটে পরিবারের দিন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে জাহিদুল দ্বিতীয়। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট ভাই আব্দুল্লাহ স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
অভাবের কারণে জীবনের প্রতিটি ধাপে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে জাহিদুলকে। অর্থাভাবে ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও সবসময় পাননি। এমনকি কোচিংয়েও ভর্তি হতে পারেননি। তবু থেমে থাকেনি তার পড়াশোনা। এর আগে ২০২৪ সালে খারিজ্জমা ইসহাক মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৪.৭২ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।
জাহিদুল বলেন, “আমার বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। পরিবারের অভাব-অনটন এবং বাবার কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমার এই ফলাফলের পেছনে বাবার অবদান সবচেয়ে বেশি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ বহন করা আমার বাবার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতেই হবে। একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের কষ্টের সংসারের অভাব দূর করতে চাই। আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সম্বল বাড়ির ভিটেটুকু। সেই সীমিত সামর্থ্য নিয়েই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমার স্বপ্ন, একদিন শিক্ষক হবো এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবো।”
ছেলের ফলাফলে আনন্দিত বাবা মিলন হাওলাদার। কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালেও রয়েছে একরাশ দুশ্চিন্তা। তিনি বলেন, “ছেলের ফলাফলে আমি অনেক খুশি। দিনমজুরের কাজ সবসময় পাওয়া যায় না। কোনো দিন কাজ পাই, আবার কোনো দিন খালি হাতে ফিরতে হয়। অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করার স্বপ্ন কখনো ছাড়িনি। যত কষ্টই হোক, ছেলেকে পড়াশোনা করাতে চাই।”
আক্ষেপের সুরে তিনি আরও বলেন, “টাকার অভাবে ছেলেকে কোচিংয়ে ভর্তি করাতে পারিনি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং পরবর্তী পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাড় করব, তা ভেবে চিন্তিত। ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই, কিন্তু আমার সামর্থ্য যে খুবই সীমিত।”
জাহিদুলের জিপিএ-৫ অর্জন শুধু একটি ভালো ফলাফল নয়; এটি দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য গল্প। তবে মেধা ও ইচ্ছাশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল অর্থের অভাবে তার উচ্চ শিক্ষার পথ যেন থমকে না যায়—এমন প্রত্যাশা পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে জাহিদুলের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: 












