দক্ষিণের জনপদ পটুয়াখালী। একদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, অন্যদিকে নদী-খাল, কৃষি, গ্রামীণ জনজীবন ও বিচিত্র জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যের মতোই পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক জীবনও বহুমাত্রিক ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ। লোকসংগীত, জারি-ভাটিয়ালি, কবিগান, যাত্রাপালা, নাটক, আবৃত্তি, সাহিত্যচর্চা, নৃত্য ও চিত্রকলার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ জেলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।
সময়ের পরিক্রমায় নানা প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও পৃষ্ঠপোষকতার সংকট পেরিয়ে পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন আজও টিকে আছে। কখনো ছিল মঞ্চনাটকের জমজমাট আয়োজন, কখনো সাহিত্য ও আবৃত্তির আসর, আবার কখনো লোকজ সংস্কৃতির উৎসব। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালে মঞ্চনাটকের নতুন প্রত্যাবর্তনও সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সূচনা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা সংগঠনের মাধ্যমে হয়নি। এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, কৃষিকাজ, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে এখানকার সংস্কৃতির ভিত্তি।
জারি, ভাটিয়ালি, পালাগান, কবিগান, বাউলগান, যাত্রাপালা ও গ্রামীণ সংগীত ছিল সাধারণ মানুষের বিনোদন এবং সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। নদী ও সাগরঘেঁষা জনপদ হওয়ায় মাঝি-মাল্লা, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন সংগ্রামও লোকসংগীতের নানা ধারায় প্রতিফলিত হয়েছে।
এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে রাখাইন জনগোষ্ঠীর। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে আরাকান থেকে আসা রাখাইন জনগোষ্ঠী কলাপাড়া, কুয়াকাটা, গলাচিপা ও আশপাশের এলাকায় বসতি স্থাপন করে। তাদের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, বয়নশিল্প, নৃত্য, ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক রীতিনীতি পটুয়াখালীর সংস্কৃতিতে যুক্ত করেছে স্বতন্ত্র মাত্রা। পাশাপাশি চাকমাসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপস্থিতিও এ অঞ্চলের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
পটুয়াখালীর আধুনিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ১৯০১ সাল। তৎকালীন পটুয়াখালী মহকুমায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পটুয়াখালী ড্রামেটিক ক্লাব’। স্থানীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিষয়ক প্রকাশিত তথ্যে এটিকে এ অঞ্চলের প্রথম দিককার প্রাতিষ্ঠানিক নাট্য সংগঠন এবং বাংলাদেশের প্রাচীন নাট্যসংগঠনগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোতাহার মিয়া, জ্ঞান ভূষণ দাস, জোয়াদুল করিম, ফণি ভূষণ দাশগুপ্ত, নলিনী রঞ্জন মজুমদার, বেচা ঠাকুর, নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য ও সুখময় সমদ্দারসহ স্থানীয় সংস্কৃতি প্রেমীদের উদ্যোগে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই সংগঠনের মাধ্যমে পটুয়াখালীতে নাট্যচর্চা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি বাইরের শিল্পীদের অংশগ্রহণে নাটক মঞ্চস্থ হতো। একসময় শহরের সাংস্কৃতিক পরিবেশে নাটক হয়ে ওঠে অন্যতম আকর্ষণ।
১৯৪৬ সালে পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ‘মুসলিম আট রেনেসাঁ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে। আসাদুল হক, মোয়াজ্জেম হোসেন, এ টি এম ওবায়েদুল্লাহ নান্নু মিয়া, কে বি এম শামসুল হক, আলী আশরাফ ও আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন সংস্কৃতি প্রেমী ব্যক্তির উদ্যোগে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। এ সময় ‘ইয়াং ড্রামেটিক ক্লাব’ ও ‘মুকুল ফৌজ’-এর মতো সংগঠনও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
তৎকালীন ছায়াবানী সিনেমা হল, যা বর্তমানে পুরাতন টাউন হল নামে পরিচিত, ছিল নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অন্যতম কেন্দ্র। প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদসহ সে সময়ের গুণী শিল্পীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানগুলো আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪-৪৫ সালের দিকে পটুয়াখালীর পবিত্র কুমার দে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান ধারণ করেন বলে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিষয়ক লেখায় উল্লেখ রয়েছে। একই সময়ে নবাবপাড়ার কাপ্তান বিশ্বাস কলকাতার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান বলে ওই ইতিহাসে তথ্য পাওয়া যায়।
পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে কবি খন্দকার খালেক, জলিল উদ্দিন আহমেদ, আবদুল করিম, আজাহার উদ্দিন আহমেদ, আবদুল আজিজ ও সৈয়দ আশরাফসহ প্রগতিশীল ব্যক্তিদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শহীদ স্মৃতি পাঠাগার’। পাঠাগারটি শুধু বই পড়ার স্থান ছিল না; এটি হয়ে ওঠে সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তা ও মননচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিভিন্ন সময়ে লেখক, কবি, সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পটুয়াখালীর মানুষের জীবন ও মননে গভীর প্রভাব ফেলে। স্বাধীনতার পর দেশ গঠনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক জাগরণেও নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।
১৯৭২ সালে পটুয়াখালীতে প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনটি গান, নাটক, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে।
১৯৭৭ সালে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় জেলা শিল্পকলা একাডেমি। এটি জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৮১ সালে জেলা শিশু একাডেমি এবং জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদের পটুয়াখালী জেলা শাখার কার্যক্রম শুরু হয়। শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক বিকাশ, সংগীত চর্চা ও রবীন্দ্র সংগীতের প্রসারে এসব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন অবদান রাখতে শুরু করে।
আশির দশক ছিল পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য সময়। ১৯৮২ সালে নির্মল কুমার দাশগুপ্ত, অতুল চন্দ্র দাস ও মঞ্জুসহ কয়েকজনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুপ্তি’ খেলাঘর আসর। ১৯৮৫ সালে ঝন্টু দাস, অজিত চক্রবর্তী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, চিন্ময় কর্মকার ও আক্রাম খানের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে ‘প্রতিভা’ শিল্পীগোষ্ঠী।
১৯৮৮ সালে সৈয়দ মিজানুর রহমান, অধ্যাপক সুকুমার দত্ত, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রব আকন, সজলেন্দু দাস ও গাজী মঈনউদ্দিন টারজানসহ কয়েকজনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দখিনা খেলাঘর আসর’।
নব্বইয়ের দশকে পটুয়াখালী সরকারি কলেজবকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় সাংস্কৃতিক চেতনা ও প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বিহঙ্গ’ সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৯৪ সালে কলেজে আত্ম প্রকাশ করে ‘নন্দন’ সাংস্কৃতিক সংগঠন। একই সময় গড়ে ওঠে পটুয়াখালী গণনাট্য ফোরাম।
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুন্দরম’ সাংস্কৃতিক সংগঠন। সংগঠনটি নাট্য চর্চা, মঞ্চ নাটক ও গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে সুন্দরম নাট্যমঞ্চ সম্মানীর বিনিময়ে নাটক প্রদর্শন এবং নিয়মিত নাট্যচর্চার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে নতুন ধারার সূচনা করে।
পটুয়াখালীর নাট্য চর্চাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে। ১৯৭৭ সালে নির্মল কুমার দাশগুপ্ত রচিত ও নির্দেশিত ‘নন্দিত আলোকে এস’ নাটকটি শিল্পকলা একাডেমির একটি উৎসবে ঢাকায় মঞ্চস্থ হয়। একই উৎসবে পটুয়াখালীর পুরোনো নাট্যসংগঠন ড্রামেটিক ক্লাবও নাটক মঞ্চস্থ করার সুযোগ পায়। ১৯৯৬ সালে পটুয়াখালী সরকারি কলেজের নন্দন সাংস্কৃতিক সংগঠন খুলনা বেতারে নাটক প্রচার করে। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এম নূরুল ইসলাম রচিত ও নির্দেশিত ‘কুয়াকাটা’ নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এটি পটুয়াখালীর নাট্যচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
২০০৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্য উৎসবে সুন্দরম নাট্যমঞ্চের ‘কাজল লতার পালা’ নাটক প্রশংসা অর্জন করে। নাটকটি রচনা করেন এম নূরুল ইসলাম এবং নির্দেশনা দেন মুজাহিদুল ইসলাম প্রিন্স।
একই সময়ে সুন্দরম চিলড্রেন্স থিয়েটার শিশু-কিশোর নাট্য চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে এবং বাংলাদেশ পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ লাভ করে।
২০০০ সালের পর পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০০২ সালে বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা, ২০০৬ সালে পটুয়া খেলাঘর আসরসহ বিভিন্ন সংগঠন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।
এ ছাড়া ‘কলকাকলী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন’, ‘গ্রামীণ শিল্পী গোষ্ঠী’, ‘লোক সাংস্কৃতিক সংঘ’, ‘সুর বিহার’ ও ‘সাগরকন্যা শিল্পাঙ্গন’সহ বিভিন্ন সংগঠন স্থানীয় পর্যায়ে সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখে।
২০১১ সালের ৬ আগস্ট থেকে ‘দখিনের কবিয়াল’ পটুয়াখালীর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা, লালন ও বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও ‘চন্দ্রদ্বীপ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন’ ও ‘সপ্তসুর সংগীত চর্চা কেন্দ্র’ নামে ও দুটি সংগঠন তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘জাসাস’ এর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও পটুয়াখালীতে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
২০১২ সালে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন সাহসিকার উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সাত দিনব্যাপী নাট্য উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে বিভিন্ন নাট্যদলের অংশগ্রহণ পটুয়াখালীর মঞ্চ নাটকের ঐতিহ্যকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।
পটুয়াখালীর সংস্কৃতিকে শুধু শহর কেন্দ্রিক সংগীত ও নাট্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। কলাপাড়ার কুয়াকাটা ও আশপাশের রাখাইন পল্লীগুলো এ জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাখাইনদের বয়ন শিল্প, নিজস্ব পোশাক, নৃত্য, ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠান এ অঞ্চলের সংস্কৃতিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ২০১১ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রাখাইন ও চাকমা শিল্পীদের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষ আকর্ষণ। অনুষ্ঠানে রাখাইন শিল্পীরা নৃত্য ও নাটক পরিবেশন করেন। জারি গান ও যাত্রাপালাও পরিবেশিত হয়। এ ধরনের আয়োজন প্রমাণ করে, পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহুজাতিক ও বহুস্বরের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, পটুয়াখালী সদর উপজেলায় ৩১টি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। কলাপাড়ায় পাঁচটি এবং দশমিনায় সাতটি সংগঠনের তথ্যও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
পটুয়াখালী থিয়েটার, সবুজ সংঘ, শহীদ স্মৃতি পাঠাগার, পটুয়া সাহিত্য পরিষদ, সুন্দরম, লিখন সাহিত্য পরিষদ, বিকিরণ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন, প্রতিভা শিল্পী গোষ্ঠী, লেখক সমন্বয় পরিষদ, মুক্তপ্রাঙ্গণ, লেখক আড্ডা, কলকাকলী ও লোকসংগীত একাডেমিসহ বিভিন্ন সংগঠন এ জেলার সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করছে।
পাশাপাশি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর, রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ, নজরুল চর্চা কেন্দ্র ও জাতীয় কবিতা পরিষদের মতো সংগঠনের কার্যক্রমও রয়েছে।
তবে সংগঠনের সংখ্যা থাকলেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ নিশ্চিত হয় না। নিয়মিত মঞ্চ নাটক, সাহিত্য সম্মেলন, সংগীতানুষ্ঠান, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় শিল্পীদের পেশাগত সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ২০২৬ সালের ২৮ আগস্টের মঞ্চ নাটক। দীর্ঘ প্রায় তিন বছরের বিরতির পর জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে আবারও মঞ্চস্থ হয় নাটক। ‘থিয়েটারওয়ালা’ নামের নাটকটি মঞ্চস্থ করে স্থানীয় নাট্যদল ‘আগুনমুখা’। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রয়াত নাট্য ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক ফজলুল করিমের স্মরণে নাটকটি মঞ্চস্থ করা হয়। নাটকটি রচনা করেন স্বপ্নীল দাস এবং নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় ছিলেন আবদুল্লাহ আশরাফ অপূর্ব (আনিম)।
দীর্ঘ বিরতির পর দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, পটুয়াখালীর মানুষের মধ্যে এখনো মঞ্চ নাটকের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু নিয়মিত আয়োজন, সাংগঠনিক উদ্যোগ ও শিল্পীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ।
পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও নানা সীমাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে। নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজনের অভাব, পর্যাপ্ত অর্থায়নের সংকট, মহড়া ও প্রদর্শনীর উপযুক্ত স্থানের সীমাবদ্ধতা, নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ঘাটতি এবং শিল্পীদের পেশাগত স্বীকৃতির অভাব অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে গ্রামীণ লোক সংস্কৃতি, কবিগান, জারি-ভাটিয়ালি, যাত্রাপালা ও পালাগানের অনেক ধারাই নিয়মিত চর্চার অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রতিটি উপজেলায় নিয়মিত সাংস্কৃতিক উৎসব, লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণ, প্রবীণ শিল্পীদের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ সংরক্ষণ, শিশু-কিশোরদের প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় নাট্যদলগুলোর জন্য নিয়মিত মঞ্চায়নের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, তথ্যচিত্র নির্মাণ ও প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
১৯০১ সালের ড্রামেটিক ক্লাব থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলনের চেতনায় গড়ে ওঠা শহীদ স্মৃতি পাঠাগার, স্বাধীনতার পর উদীচীর যাত্রা, জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা, সুন্দরমের নাট্যচর্চা এবং ২০২৬ সালে ‘থিয়েটারওয়ালা’র মঞ্চায়ন—প্রতিটি অধ্যায় পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ইতিহাস তৈরি করেছেন অসংখ্য সংস্কৃতিপ্রেমী, নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও সংগঠক। তাঁদের অনেকেই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া কাজ ও সাংস্কৃতিক চর্চার উত্তরাধিকার এখনো বহমান।
পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু অতীতের গৌরব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। প্রয়োজন সেই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া এবং নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ করা। কারণ একটি জনপদের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; তার মানুষের শিল্পবোধ, সাহিত্য চর্চা, সংস্কৃতি ও মননশীলতার মধ্যেও নিহিত থাকে। সেই বিবেচনায় পটুয়াখালীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
মীর মোঃ ফরিদ উদ্দিন: 











