মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল বঙ্গভবনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তাঁর কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এ ঘটনা নিছক একটি আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ নয়—বরং এটি রাষ্ট্রীয় সৌজন্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের একটি ইতিবাচক নিদর্শন।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, একুশে ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন, একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় কিংবা রাষ্ট্রীয় উৎসব-অনুষ্ঠানে পারস্পরিক উপস্থিতি—এসবই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপক্বতার পরিচায়ক। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন কিংবা ক্ষমতার পালাবদল নয়; গণতন্ত্র একটি মূল্যবোধ, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ একে অন্যকে সম্মান জানিয়ে চলবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।
এই শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ একজন প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর দায়িত্ব ও মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে—এ বিশ্বাস অমূলক নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ইন্টারিম সময়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কোনো যৌথ উপস্থিতি বা একসঙ্গে ছবি জনগণ কখনও দেখেনি। বরং সেই সময় একজন রাষ্ট্রপতিকে যতটা সম্ভব কোণঠাসা করে রাখা যায়—এমন প্রবণতাই দৃশ্যমান ছিল। অথচ রাষ্ট্রপতি দলীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হলেও সংবিধান অনুযায়ী তিনি কোনো দলের প্রতিনিধি নন। তিনি একটি সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি—যার পদটি সম্মান ও মর্যাদার শীর্ষে থাকলেও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র নয়।
রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে কটূক্তি, অবমাননাকর বক্তব্য এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে—আমি তাদের দলে নই। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে মনে হয়, তিনি যেভাবেই এবং যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হয়ে থাকুন না কেন, মানুষ হিসেবে তিনি নিরীহ, শান্ত স্বভাবের এবং নিপাট ভদ্রলোক।
৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনে যে চরম একাকিত্ব ও অসহায়ত্ব তৈরি হয়েছিল, তা তাঁকে কার্যত গৃহবন্দী এক পুতুলে পরিণত করেছিল।
নির্বাচন-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে তিনি সে বাস্তবতার অনেক কিছুই প্রকাশ করেছেন। অথচ তাঁর নিজ দলের অনেকেই তাঁকে ‘মীরজাফর’, ‘মোস্তাক’ ইত্যাদি অপমানজনক অভিধায় আক্রমণ করে চলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সে সময় এই মানুষটির করণীয়ই বা কী ছিল?
তিনি চাইলে পদত্যাগ করতে পারতেন। তিনি চাইলে জেলে যেতে পারতেন। এমনকি মৃত্যুবরণ করাও তাঁর জন্য অসম্ভব ছিল না। কিন্তু তাতে কি দেশের কোনো উপকার হতো? বরং তিনি পদত্যাগ করলে হয়তো নির্বাচনই হতো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্ন তো দূরের কথা—পুরো রাষ্ট্রকাঠামোই ভিন্নদিকে মোড় নিতে পারত।
আর যারা “মন খুলে কথা বলার নির্দেশ” পেয়েও তখন কথা বলেননি, তারা আজ যেটুকু বলতে পারছেন—সেটুকুও হয়তো বলার সুযোগ থাকত না। বাস্তবতা হলো, দেশ আপাতত চরম মৌলবাদী ও উগ্র রাজনৈতিক শক্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
অতএব রাষ্ট্রপতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদযোগ্য। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, তাঁকে টিকিয়ে না রাখলে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনও হয়তো সুদূরপরাহত থেকে যেত।
মহামান্য রাষ্ট্রপতির সহিষ্ণুতা, ধৈর্য এবং নীরব কষ্টসহিষ্ণুতা যেমন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞাও দলটিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে সহায়ক হয়েছে। ফলে দেশ হয়তো আরও বড় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে।
আজ স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে—শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর মতো একজন মানুষের অসময়ে সরে যাওয়ার চেয়ে তাঁর দায়িত্ব আঁকড়ে থাকা দেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক সময় ইতিহাসে কিছু মানুষের নীরব উপস্থিতিই রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাতে হয়—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে তিনি যথাযথ সম্মান দিয়ে যাচ্ছেন। শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় ঈদগাহ এবং বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ—এই ধারাবাহিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে যে শুভ সূচনা তৈরি করেছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে দেশের রাজনীতির ক্লাইমেট পরিবর্তন হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রতিহিংসা, অবিশ্বাস এবং কুৎসিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেই সংস্কৃতির পরিবর্তে ভবিষ্যতে এক নতুন, ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা নির্মিত হতে পারে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
রাষ্ট্রীয় সৌজন্য যদি রাজনৈতিক আচরণের নিয়মে পরিণত হয়, তবে দেশ লাভবান হবেই।
মাসুদ আলম বাবুল
পটুয়াখালী।
মাসুদ আলম বাবুল: 













