০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গলাচিপায় অবসর ভাতা না পেয়ে চরম অর্থকষ্টে প্রবীণ শাহজাহান

“জীবিত অবস্থায়ই যদি নিজের জমানো টাকা না পেলাম, তবে মৃত্যুর পর সেই টাকা আমার কী কাজে লাগবে?”—আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মো. শাহজাহান মিয়া।

দীর্ঘ চার দশক সততার সঙ্গে কর্মজীবন শেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে অবসরে গেলেও সরকারি পাওনা হিসেবে অবসর ও কল্যাণ ভাতার একটি টাকাও এখনো হাতে পাননি বাষট্টি বছর বয়সী এই প্রবীণ। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ অনলাইনে আবেদন করলেও প্রায় দুই বছর পার হতে চলল, কিন্তু এখনো মেলেনি তাঁর ন্যায্য পাওনা। ফাইলটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আটকে থাকায় চরম অনিশ্চয়তা আর তীব্র অর্থকষ্টে দিন কাটছে তাঁর।

গলাচিপার রতনদী তালতলী ইউনিয়নের উলানিয়া এলাকায় শাহজাহান মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থতা ও অর্থসংকটে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন তিনি। বর্তমানে সহধর্মিণীকে নিয়ে কোনোমতে বসবাস করছেন। দুই ছেলে থাকলেও তারা বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর নেয় না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহজাহান মিয়া সাংবাদিক সঞ্জিব দাসকে বলেন, দীর্ঘদিন সততার সঙ্গে চাকরি করলেও বেতনের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ সামলে কোনো ধন-সম্পত্তি করতে পারেননি। প্রতি মাসেই তাঁর মূল বেতন থেকে ১০ শতাংশ টাকা অবসর তহবিলের জন্য কেটে রাখা হতো। শেষ বয়সে এসে নিজের সেই ন্যায্য পাওনাটুকু পেতেই এখন তাঁকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জীবিত অবস্থায় এই টাকা আর হাতে পাবেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

শাহজাহান মিয়ার প্রতিবেশী এবং একই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবর রহমান জানান, “এই প্রবীণ কর্মচারী বর্তমানে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সংসারের অভাব এতটাই প্রকট যে নিয়মিত দুবেলা খাবার জোগাড় করাই তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে, এর ওপর অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনতে পারছেন না। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও অর্থাভাব মিলিয়ে তিনি চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।”

প্রতিষ্ঠান প্রধান মো. মাহফুজুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “শাহজাহান মিয়া নিয়ম অনুযায়ী অবসরে যাওয়ার পর বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র যথাসময়ে অনলাইনে সফলভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”

তিনি জানান, “সংশ্লিষ্ট দপ্তর এখনো ২০২২ সালের অনেক আবেদনই নিষ্পত্তি করতে পারেনি, আর শাহজাহান মিয়া অবসরে গেছেন ২০২৪ সালে। ফলে তাঁর মতো হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। সরকার দ্রুত এই অবসর ও কল্যাণ ভাতার অর্থ ছাড় করলে ভুক্তভোগীরা শেষ বয়সে এসে কিছুটা স্বস্তি পাবেন।”

গলাচিপা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “এ বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষা অফিসের সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। আবেদনটি অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে পাঠানো হয়, সেখান থেকেই এটি আইডি নম্বরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের চরম দীর্ঘসূত্রিতার কারণে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা শেষ বয়সের প্রধান ভরসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে মানবিক বিবেচনায় দ্রুত শাহজাহান মিয়ার পাওনা অর্থ বুঝিয়ে দিয়ে তাঁর দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার ও এলাকাবাসী।

Tag:

গলাচিপায় অবসর ভাতা না পেয়ে চরম অর্থকষ্টে প্রবীণ শাহজাহান

আপডেট সময়: ০৪:৫৬:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

“জীবিত অবস্থায়ই যদি নিজের জমানো টাকা না পেলাম, তবে মৃত্যুর পর সেই টাকা আমার কী কাজে লাগবে?”—আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী উলানিয়া হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মো. শাহজাহান মিয়া।

দীর্ঘ চার দশক সততার সঙ্গে কর্মজীবন শেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে অবসরে গেলেও সরকারি পাওনা হিসেবে অবসর ও কল্যাণ ভাতার একটি টাকাও এখনো হাতে পাননি বাষট্টি বছর বয়সী এই প্রবীণ। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ অনলাইনে আবেদন করলেও প্রায় দুই বছর পার হতে চলল, কিন্তু এখনো মেলেনি তাঁর ন্যায্য পাওনা। ফাইলটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আটকে থাকায় চরম অনিশ্চয়তা আর তীব্র অর্থকষ্টে দিন কাটছে তাঁর।

গলাচিপার রতনদী তালতলী ইউনিয়নের উলানিয়া এলাকায় শাহজাহান মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অসুস্থতা ও অর্থসংকটে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন তিনি। বর্তমানে সহধর্মিণীকে নিয়ে কোনোমতে বসবাস করছেন। দুই ছেলে থাকলেও তারা বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর নেয় না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহজাহান মিয়া সাংবাদিক সঞ্জিব দাসকে বলেন, দীর্ঘদিন সততার সঙ্গে চাকরি করলেও বেতনের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ সামলে কোনো ধন-সম্পত্তি করতে পারেননি। প্রতি মাসেই তাঁর মূল বেতন থেকে ১০ শতাংশ টাকা অবসর তহবিলের জন্য কেটে রাখা হতো। শেষ বয়সে এসে নিজের সেই ন্যায্য পাওনাটুকু পেতেই এখন তাঁকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জীবিত অবস্থায় এই টাকা আর হাতে পাবেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

শাহজাহান মিয়ার প্রতিবেশী এবং একই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবর রহমান জানান, “এই প্রবীণ কর্মচারী বর্তমানে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সংসারের অভাব এতটাই প্রকট যে নিয়মিত দুবেলা খাবার জোগাড় করাই তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে, এর ওপর অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধও কিনতে পারছেন না। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও অর্থাভাব মিলিয়ে তিনি চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।”

প্রতিষ্ঠান প্রধান মো. মাহফুজুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “শাহজাহান মিয়া নিয়ম অনুযায়ী অবসরে যাওয়ার পর বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র যথাসময়ে অনলাইনে সফলভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”

তিনি জানান, “সংশ্লিষ্ট দপ্তর এখনো ২০২২ সালের অনেক আবেদনই নিষ্পত্তি করতে পারেনি, আর শাহজাহান মিয়া অবসরে গেছেন ২০২৪ সালে। ফলে তাঁর মতো হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। সরকার দ্রুত এই অবসর ও কল্যাণ ভাতার অর্থ ছাড় করলে ভুক্তভোগীরা শেষ বয়সে এসে কিছুটা স্বস্তি পাবেন।”

গলাচিপা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “এ বিষয়ে স্থানীয় শিক্ষা অফিসের সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। আবেদনটি অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে পাঠানো হয়, সেখান থেকেই এটি আইডি নম্বরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের চরম দীর্ঘসূত্রিতার কারণে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা শেষ বয়সের প্রধান ভরসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে মানবিক বিবেচনায় দ্রুত শাহজাহান মিয়ার পাওনা অর্থ বুঝিয়ে দিয়ে তাঁর দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার ও এলাকাবাসী।