০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাউফলে পাশাপাশি কবরে শায়িত হলেন স্বামী-স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পাঁচজন!

পটুয়াখালীর বাউফলের একে একে নিভে গেল একটি পরিবারের সবকটি প্রাণ। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস বিস্ফোরণের আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় পর্যায়ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন স্বামী, স্ত্রী ও তাদের তিন সন্তান।

শনিবার (১৬ মে) সকালে যখন মা সালমা বেগম (৪০), একমাত্র ছেলে মুন্না (১২), দুই মেয়ে মুন্নী (৯) ও শিশু কথা’র (৭) সাদা কফিনে মোড়ানো লাশ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের কাড়াল বাড়িতে এসে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

এর আগে গত সোমবার সকালে দাফন করা হয়েছিল গৃহকর্তা কালাম মিয়াকে (৫০)। আজ নতুন বাড়ির পুকুরপাড়ে কামাল মিয়ার কবরের ঠিক পাশেই বাকি চারজনকে শায়িত করা হয়েছে। একই সারিতে পাশাপাশি পাঁচটি তাজা কবরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত মানুষ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘ দিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি ১০ তলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুম নিয়ে ভাড়া থাকতেন তিনি। গত রবিবার (১০ মে) সকাল ৬টার দিকে কালাম মিয়া রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যান। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। ঘরটিতে আগে থেকেই জমে থাকা লিকেজ গ্যাস দেশলাইয়ের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বলন্ত আগুনের মাঝেও বাবা কালাম মিয়া ঘরের দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা কামালের স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তাসহ সবাইকে নির্মমভাবে গ্রাস করে নেয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন।

বার্ন ইউনিটের বিছানায় একে একে নিভে গেছে পাঁচটি প্রাণ। মৃত্যুর এই নির্মম মিছিলে প্রথমে বিদায় নেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কালাম মিয়া। দুর্ঘটনার দিন রবিবারই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। স্বজনরা রাতেই তার মরদেহ নিয়ে আসেন গ্রামের বাড়িতে এবং সোমবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়। তখনো কেউ জানত না, এই কবরের পাশে আরও চারটি কবর খুঁড়তে হবে।

বুধবার বিকেল মৃত্যুরকোলে ঢলে পড়ে ৭ বছরের শিশু কথা। মায়ের কোল খালি করে চলে যাওয়া কথার লাশ রাখা হয় হাসপাতালের হিমাগারে। বুধবার রাত ১১টা বোনকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় বৃহস্পতিবার সকালে মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না (১২)। একইদিন বিকালে না ফেরার দেশে চলে যায় মেঝ মেয়ে মুন্নী (৯)। শুক্রবার সকাল ৮টা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম (৪০)।

শনিবার (১৬মে) সকালে যখন মা ও তিন সন্তানের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কাড়াল বাড়ির উঠানে এসে থামে, তখন উপস্থিত শত শত মানুষের চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে যখন একে একে চারটি সাদা কফিন বের করা হচ্ছিল, তখন স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। শেষ বারের মতো একনজর দেখতে আসা মানুষের ভিড়ে চারপাশ থমকে যায়। এরপর সকাল ১০টায় জানাজা শেষে কামাল মিয়ার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তার স্ত্রী ও সন্তানদের।

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, প্রায় ২০-২২ বছর আগে কামাল বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে উজিরপুরে বিয়ে করেছিল। কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র ২০-২৫ দিন আগেও ঢাকায় ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই-ভাবি আর পুলাপাইনডি এভাবে আমাদের ছেড়ে এক্কেরে চলে যাবে!

কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ঈদের আগে ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। বাড়িতে ভাইয়েরা মিলে একটা নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ ধরছিল। ভাই বলছিল ‘এবার কোরবানির ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু, বাকি জীবনটা স্ত্রী-সন্তান নিয়া দেশের বাড়িতেই থাকমু।’ ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়া!

এদিকে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পেছনে ভবন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন এক স্বজন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া আগের দিনই ভবনের দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ানের অলসতা করে বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানায়নি। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজ একটি পুরো পরিবার এভাবে শেষ হয়ে যেত না।

Tag:

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সেইভ করুন:

আমাদের সম্পর্কে জানুন:

South BD News 24

South BD News 24 is committed to publish the daily news of South Bengal based on authenticity, honesty and courage...

বাউফলে পাশাপাশি কবরে শায়িত হলেন স্বামী-স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পাঁচজন!

বাউফলে পাশাপাশি কবরে শায়িত হলেন স্বামী-স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পাঁচজন!

আপডেট সময়: ০৯:০৮:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

পটুয়াখালীর বাউফলের একে একে নিভে গেল একটি পরিবারের সবকটি প্রাণ। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস বিস্ফোরণের আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় পর্যায়ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন স্বামী, স্ত্রী ও তাদের তিন সন্তান।

শনিবার (১৬ মে) সকালে যখন মা সালমা বেগম (৪০), একমাত্র ছেলে মুন্না (১২), দুই মেয়ে মুন্নী (৯) ও শিশু কথা’র (৭) সাদা কফিনে মোড়ানো লাশ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের কাড়াল বাড়িতে এসে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

এর আগে গত সোমবার সকালে দাফন করা হয়েছিল গৃহকর্তা কালাম মিয়াকে (৫০)। আজ নতুন বাড়ির পুকুরপাড়ে কামাল মিয়ার কবরের ঠিক পাশেই বাকি চারজনকে শায়িত করা হয়েছে। একই সারিতে পাশাপাশি পাঁচটি তাজা কবরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত মানুষ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘ দিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি ১০ তলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুম নিয়ে ভাড়া থাকতেন তিনি। গত রবিবার (১০ মে) সকাল ৬টার দিকে কালাম মিয়া রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যান। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। ঘরটিতে আগে থেকেই জমে থাকা লিকেজ গ্যাস দেশলাইয়ের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বলন্ত আগুনের মাঝেও বাবা কালাম মিয়া ঘরের দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা কামালের স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তাসহ সবাইকে নির্মমভাবে গ্রাস করে নেয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন।

বার্ন ইউনিটের বিছানায় একে একে নিভে গেছে পাঁচটি প্রাণ। মৃত্যুর এই নির্মম মিছিলে প্রথমে বিদায় নেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কালাম মিয়া। দুর্ঘটনার দিন রবিবারই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। স্বজনরা রাতেই তার মরদেহ নিয়ে আসেন গ্রামের বাড়িতে এবং সোমবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়। তখনো কেউ জানত না, এই কবরের পাশে আরও চারটি কবর খুঁড়তে হবে।

বুধবার বিকেল মৃত্যুরকোলে ঢলে পড়ে ৭ বছরের শিশু কথা। মায়ের কোল খালি করে চলে যাওয়া কথার লাশ রাখা হয় হাসপাতালের হিমাগারে। বুধবার রাত ১১টা বোনকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় বৃহস্পতিবার সকালে মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না (১২)। একইদিন বিকালে না ফেরার দেশে চলে যায় মেঝ মেয়ে মুন্নী (৯)। শুক্রবার সকাল ৮টা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম (৪০)।

শনিবার (১৬মে) সকালে যখন মা ও তিন সন্তানের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কাড়াল বাড়ির উঠানে এসে থামে, তখন উপস্থিত শত শত মানুষের চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে যখন একে একে চারটি সাদা কফিন বের করা হচ্ছিল, তখন স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। শেষ বারের মতো একনজর দেখতে আসা মানুষের ভিড়ে চারপাশ থমকে যায়। এরপর সকাল ১০টায় জানাজা শেষে কামাল মিয়ার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তার স্ত্রী ও সন্তানদের।

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, প্রায় ২০-২২ বছর আগে কামাল বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে উজিরপুরে বিয়ে করেছিল। কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র ২০-২৫ দিন আগেও ঢাকায় ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই-ভাবি আর পুলাপাইনডি এভাবে আমাদের ছেড়ে এক্কেরে চলে যাবে!

কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ঈদের আগে ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। বাড়িতে ভাইয়েরা মিলে একটা নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ ধরছিল। ভাই বলছিল ‘এবার কোরবানির ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু, বাকি জীবনটা স্ত্রী-সন্তান নিয়া দেশের বাড়িতেই থাকমু।’ ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়া!

এদিকে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পেছনে ভবন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন এক স্বজন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া আগের দিনই ভবনের দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ানের অলসতা করে বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানায়নি। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজ একটি পুরো পরিবার এভাবে শেষ হয়ে যেত না।