০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গলাচিপায় ঝালমুড়ি বিক্রি করা সেই দুই শিশুর দায়িত্ব নিলেন ইউএনও; মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই খাতা। সে বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতায় দুই হাতে পান-ঝালমুড়ির পসরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাটে-ঘাটে। বাবার অনেক আগেই কোনো খোঁজ নেই, মা চলে গেছেন অন্য সংসারে। বৃদ্ধ দাদার সামান্য আয়ে দুবেলা খাবার জোটানোই যখন কঠিন, তখন পড়াশোনা ছিল অবুঝ দুই ভাইয়ের কাছে এক বিলাসী স্বপ্ন।

সেই দুই শিশুর জীবনে অবশেষে আশার আলো জাগিয়েছে গলাচিপা উপজেলা প্রশাসন। ব্যক্তি উদ্যোগে এ দুই শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুজর মো. ইজাজুল হক।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার উত্তর চরবিশ্বাসের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দুই ভাই রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহ। বাবা আলিউল মাতুব্বর দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তাদের মা শিরিনা বেগম। একপর্যায়ে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র সংসার শুরু করেন। অবুঝ দুই ভাই রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে রেখে যায় বৃদ্ধ দাদা মনির মাতুব্বরের কাছে।মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত দুই ভাইয়ের শেষ আশ্রয় হয় বৃদ্ধ ন্যুজ দাদা মনির মাতুব্বরের কাছে।

নিজের সংসারের খাবার জোগাড় করতেই যার হিমশিম খেতে হয়, তার পক্ষে দুই নাতির ভরণ পোষণ করা ছিল কঠিন। অভাবের কাছে তাই হার মানতে হয় দুই শিশুর শৈশবকে। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সেই জীবিকার সন্ধানে পথে নামতে হয়। বিভিন্ন হাট-বাজার ও খেলার মাঠে পান ও ঝালমুড়ি বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোভাবে দুমুঠো খাবার জোটে।

স্কুলে যাওয়ার স্বপ্নটা থেমে যায়নি। সুযোগ পেলেই তারা স্কুলের পোশাক পরা শিশুদের দিকে তাকিয়ে থাকত। তাদেরও ইচ্ছে ছিল বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার, পড়াশোনা করে বড় হওয়ার। কিন্তু অভাব আর পারিবারিক অসহায়ত্ব সেই স্বপ্নের বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি দুই ভাইয়ের এই জীবন সংগ্রামের কথা গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুজর মো. ইজাজুল হকের নজরে আসে। তিনি রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে নেন। কথা বলেন, শোনেন তাদের জীবনের গল্প ও পড়াশোনার ইচ্ছার কথা। এরপর শিশু দুই ভাইকে স্কুলে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন। তার (ইউএনওর) নির্দেশনায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের স্কুল ড্রেসের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বদলে গেছে দুই ভাইয়ের মুখের ভাষা। দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টের ভেতর ফুটে উঠেছে আনন্দের হাসি। যে হাতে এতদিন পান ও ঝালমুড়ির পসরা ছিল, সেই হাতে এখন বই-খাতা। রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চায় নিজেদের জীবন।

মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হালিম বলেন, “বুধবার রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে আমরা স্কুলে ভর্তি করেছি। বৃহস্পতিবার ওদের প্রথম ক্লাস ছিল। রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ লক্ষ করেছি। আমরা নিয়মিত খোঁজ খবর রাখছি।”

গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, “রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর কথা জানতে পেরে তাদের আমার অফিসে নিয়ে আসি। পরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। ওদের স্কুলে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে ভালো লাগছে। ওদের সার্বিক বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন খেয়াল রাখবে।”

স্থানীয়দের মতে, বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো শুধু শুরু। এই দুই শিশুর পড়াশোনা যাতে মাঝপথে থেমে না যায়, সে জন্য নিয়মিত সহযোগিতা ও নজরদারি প্রয়োজন। কারণ একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে বিদ্যালয়ে পাঠানো নয়—তার সামনে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া।

রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর গল্প তাই কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়; এটি ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, স্বপ্ন ফিরে পাওয়ার গল্প। আজ তাদের হাতে পান-ঝালমুড়ির পসরা নেই—আছে বই। আর সেই বইয়ের পাতায় হয়তো লেখা হচ্ছে তাদের নতুন জীবনের প্রথম অধ্যায়।

Tag:

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে এলপিজি গ্যাসের বাজারে অভিযান; দুই ডিলারকে জরিমানা করলো প্রশাসন

গলাচিপায় ঝালমুড়ি বিক্রি করা সেই দুই শিশুর দায়িত্ব নিলেন ইউএনও; মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

আপডেট সময়: ০৯:৫২:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই খাতা। সে বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতায় দুই হাতে পান-ঝালমুড়ির পসরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাটে-ঘাটে। বাবার অনেক আগেই কোনো খোঁজ নেই, মা চলে গেছেন অন্য সংসারে। বৃদ্ধ দাদার সামান্য আয়ে দুবেলা খাবার জোটানোই যখন কঠিন, তখন পড়াশোনা ছিল অবুঝ দুই ভাইয়ের কাছে এক বিলাসী স্বপ্ন।

সেই দুই শিশুর জীবনে অবশেষে আশার আলো জাগিয়েছে গলাচিপা উপজেলা প্রশাসন। ব্যক্তি উদ্যোগে এ দুই শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুজর মো. ইজাজুল হক।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার উত্তর চরবিশ্বাসের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দুই ভাই রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহ। বাবা আলিউল মাতুব্বর দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তাদের মা শিরিনা বেগম। একপর্যায়ে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র সংসার শুরু করেন। অবুঝ দুই ভাই রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে রেখে যায় বৃদ্ধ দাদা মনির মাতুব্বরের কাছে।মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত দুই ভাইয়ের শেষ আশ্রয় হয় বৃদ্ধ ন্যুজ দাদা মনির মাতুব্বরের কাছে।

নিজের সংসারের খাবার জোগাড় করতেই যার হিমশিম খেতে হয়, তার পক্ষে দুই নাতির ভরণ পোষণ করা ছিল কঠিন। অভাবের কাছে তাই হার মানতে হয় দুই শিশুর শৈশবকে। যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সেই জীবিকার সন্ধানে পথে নামতে হয়। বিভিন্ন হাট-বাজার ও খেলার মাঠে পান ও ঝালমুড়ি বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়েই কোনোভাবে দুমুঠো খাবার জোটে।

স্কুলে যাওয়ার স্বপ্নটা থেমে যায়নি। সুযোগ পেলেই তারা স্কুলের পোশাক পরা শিশুদের দিকে তাকিয়ে থাকত। তাদেরও ইচ্ছে ছিল বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার, পড়াশোনা করে বড় হওয়ার। কিন্তু অভাব আর পারিবারিক অসহায়ত্ব সেই স্বপ্নের বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি দুই ভাইয়ের এই জীবন সংগ্রামের কথা গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুজর মো. ইজাজুল হকের নজরে আসে। তিনি রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে নেন। কথা বলেন, শোনেন তাদের জীবনের গল্প ও পড়াশোনার ইচ্ছার কথা। এরপর শিশু দুই ভাইকে স্কুলে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন। তার (ইউএনওর) নির্দেশনায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের স্কুল ড্রেসের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বদলে গেছে দুই ভাইয়ের মুখের ভাষা। দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টের ভেতর ফুটে উঠেছে আনন্দের হাসি। যে হাতে এতদিন পান ও ঝালমুড়ির পসরা ছিল, সেই হাতে এখন বই-খাতা। রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চায় নিজেদের জীবন।

মধ্য চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হালিম বলেন, “বুধবার রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে আমরা স্কুলে ভর্তি করেছি। বৃহস্পতিবার ওদের প্রথম ক্লাস ছিল। রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ লক্ষ করেছি। আমরা নিয়মিত খোঁজ খবর রাখছি।”

গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, “রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর কথা জানতে পেরে তাদের আমার অফিসে নিয়ে আসি। পরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। ওদের স্কুলে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে ভালো লাগছে। ওদের সার্বিক বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন খেয়াল রাখবে।”

স্থানীয়দের মতে, বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো শুধু শুরু। এই দুই শিশুর পড়াশোনা যাতে মাঝপথে থেমে না যায়, সে জন্য নিয়মিত সহযোগিতা ও নজরদারি প্রয়োজন। কারণ একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে বিদ্যালয়ে পাঠানো নয়—তার সামনে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া।

রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর গল্প তাই কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়; এটি ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, স্বপ্ন ফিরে পাওয়ার গল্প। আজ তাদের হাতে পান-ঝালমুড়ির পসরা নেই—আছে বই। আর সেই বইয়ের পাতায় হয়তো লেখা হচ্ছে তাদের নতুন জীবনের প্রথম অধ্যায়।