০৪:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কথাসাহিত্যিক আনোয়ার হোসেন বাদল: জীবন ও সাহিত্য

  • মারুফা আফ্রিন:
  • আপডেট সময়: ০১:১৯:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

“হাত দাও কবিয়াল, পথ বড় পিচ্ছিল আছড়ে না পড়ি। ততোক্ষণে পারুল বেগম এসে জুলেখার পাশে দাঁড়ায়। শাহিনুরের ভেতরে তীব্র ঝড় বইছে,চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পাছে কেউ দেখে ফেলে সে ভয়ে দ্রুত নৌকার ভেতরে চলে যায় সে,মাঝি কে তাড়া করে। বলে –

নৌকা ছাইড়া দাও মাঝি। সর্দারের জোয়ান ছেলে নৌকা ছেড়ে দেয়। বদি কোন কথা বলতে পারে না, পাথরের মক নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। তার পেছন থেকে শরতের প্রভাত বেলার সূর্য দীর্ঘ ছায়া ফেলে। নদীর উপর সে ছায়া দীর্ঘতর হয়ে শাহিনুরের এক মালাই নৌকার উপর গিয়ে পড়ে।

বদি সহ্য করতে পারে না, দু’হাতে মুখ ঢেকে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।তার কন্ঠে চাপা গোঙানী। জুলেখা পাশে এসে দাঁড়ায়। ডান হাত বদির কাঁধ স্পর্শ করলে বদি চোখ মেলে তাকায়। স্রোতের টানে শাহিনুরদের নৌকা তখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

(কৃষ্ণপক্ষের আলো)
সমস্ত পৃথিবী যখন ঘরের কোনে উষ্ণ চাঁদরে জড়িয়ে সিকি কড়ি জমানোর তালে তখন প্রকৃতির এক সন্তান মাটিতে পা ছড়িয়ে মাটি ও মানুষের গন্ধ শুকেন।তিনি আকাশের বুকে বিশাল হিমবায়ু ধারন করা বাস্পিভূত এক জলধর।

পায়রার ঢেউ যার কাছে নত স্বীকার করেছে, হেরে গেছে ভাঁজে ভাঁজে ক্ষয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, পান্তার থালা।সবকিছু হারিয়ে জিতে গিয়ে তিনি সেই পায়রার বুকেই অঙ্কন করেছেন শাহিনুর বদির এই অসম প্রেমের হৃদয়ছোঁয়া প্রেমের সমীকরণ।

‘হাঁটতে হাঁটতে একজন মানুষ হয়ে যান ইবনে বতুতা, ভাসতে ভাসতে কলম্বাস, লিখতে লিখতে কেউ একজন রবীন্দ্রনাথ। মূলতঃ ধ্যানমগ্ন না হলে
মাছরাঙাও টপকাতে পারে না আরাধ্য দেয়াল।’

হাঁটতে হাঁটতে একজন মানুষ ইবনে বতুতা হলেও আনোয়ার হোসেন বাদল একজনই।

আনোয়ার হোসেন বাদলের উপন্যাসের কিছু উদ্বৃতাংশঃ

১। মহাবিশ্বের মহাপরিচালক কি মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়েন? নইলে তার রাজ্যে শয়তানের অপশক্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়? কীভাবে তার সৃষ্টির উপর শয়তান ভর করতে পারে? কালা হাইব্যারাই বা কেনো এতোটা ক্ষমতাবান হন? (অনার্য জীবন)

২। ওটা আমাদের দেশ নয় নিখিল! তুইও মালতিকে নিয়ে চলে আয়। ধর্ম যেখানে মানুষের চেয়ে বড় হয়ে যায় সেখানে মানুষ বসবাস করতে পারেনা।সব দেশেই সংখ্যালঘুদের পূর্ব জনমের পাপ খাঁটতে ভগবান পাঠিয়েছেন নইলে মালতিকে আলাউদ্দিন শিকদারের মত ধার্মিক লোকেরা পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিতে পারে?

আরাধ্যকে আড়ালেই রাখতে, হয় নইলে আরাধ্য সাধন হয়না। (কৃষ্ণপক্ষের আলো)

৩। বাঙ্গালীর এ সমাজ বড় রুঢ়, বড় স্পর্শকাতর। মজ্জাগতভাবে সন্দেহপ্রবণ বাঙালী নারীরা লক্ষ বছর ধরে নিজের মানুষটিকে ধরে রাখার মন্ত্র তারা পিতামহী, মাতামহীদের থেকে বংশ পরম্পরায় পেয়ে থাকেন। সুতরাং নিজের মানুষটির কথা বলার ধরণ, স্বগৃহে পতিদেবের আচরণ ইত্যাদি তারা খুব বিচক্ষণতা দিয়েই যাচাই করে থাকেন। (দৃষ্টিপাত ও দ্বিতীয় গোলক)

৪। পিতা হলেই সবাই বাপজান হয়ে ওঠেন না, তারজন্যে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।(বাপজানের গল্প)

৫। তড়িৎ গতিতে ঘুরে যায় শাহিনুর; বদির হাত ধরে নিজের দিকে ঈষৎ টান মারে, ডান হাত দিয়ে তার মুখে হাত চাপা দেয়। মুর্হুতের মধ্যে শাহিনুরের শরীরের সাথে লেপ্টে যায় বদি, কেঁপে ওঠে। যেন বিদ্যুতের ছােঁয়া লেগেছে তার শরীরে সে কাঁপা হাতে শাহিনুরের ব্লাউজের হুঁক লাগিয়ে দেয়।

মাঝি তুমি একটা নিকম্মার ধারী।(নাটুয়া প্রণয়)।

৬। বিমানের বেশিরভাগ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। আহা!এই অসীম অন্তরীক্ষে বসেও মানুষ ঘুমুচ্ছে। আমার কিন্তু এক ফোটাও ঘুম হচ্ছে না। মনে মনে স্রষ্টাকে ডাকছি-হে প্রভু, হে অন্তর্যামী আমাদের নিরাপদে পৌঁছে দাও।
(ভারতে কয়েকদিন)।

কবিমন কোনো সাধারন ভাবের নয়, লেখক মন কোনো কৃত্রিমতা দিয়ে গড়া নয় তা সমম্পূর্নই ঐশী শক্তির আধারে শক্তিমান।প্রতিনিয়ত তার ভাবের পরিবর্তন হয়।কবির শব্দমালা গুলো নৈঃশব্দ্যে ভ্রমন করে থাকে পুরো সৃষ্টিজগতে।

কবিতায় তার অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ থাকলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র কবিতা। যা মলাটবদ্ধ করা উচিত বলে মনে করছি।
বনফুল যতই দামী হোক ফুলদানিতে না রাখলে তা বনেই ঝড়ে যায়।

Tag:

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সেইভ করুন:

আমাদের সম্পর্কে জানুন:

South BD News 24

South BD News 24 is committed to publish the daily news of South Bengal based on authenticity, honesty and courage...

কথাসাহিত্যিক আনোয়ার হোসেন বাদল: জীবন ও সাহিত্য

কথাসাহিত্যিক আনোয়ার হোসেন বাদল: জীবন ও সাহিত্য

আপডেট সময়: ০১:১৯:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬

“হাত দাও কবিয়াল, পথ বড় পিচ্ছিল আছড়ে না পড়ি। ততোক্ষণে পারুল বেগম এসে জুলেখার পাশে দাঁড়ায়। শাহিনুরের ভেতরে তীব্র ঝড় বইছে,চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পাছে কেউ দেখে ফেলে সে ভয়ে দ্রুত নৌকার ভেতরে চলে যায় সে,মাঝি কে তাড়া করে। বলে –

নৌকা ছাইড়া দাও মাঝি। সর্দারের জোয়ান ছেলে নৌকা ছেড়ে দেয়। বদি কোন কথা বলতে পারে না, পাথরের মক নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। তার পেছন থেকে শরতের প্রভাত বেলার সূর্য দীর্ঘ ছায়া ফেলে। নদীর উপর সে ছায়া দীর্ঘতর হয়ে শাহিনুরের এক মালাই নৌকার উপর গিয়ে পড়ে।

বদি সহ্য করতে পারে না, দু’হাতে মুখ ঢেকে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।তার কন্ঠে চাপা গোঙানী। জুলেখা পাশে এসে দাঁড়ায়। ডান হাত বদির কাঁধ স্পর্শ করলে বদি চোখ মেলে তাকায়। স্রোতের টানে শাহিনুরদের নৌকা তখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

(কৃষ্ণপক্ষের আলো)
সমস্ত পৃথিবী যখন ঘরের কোনে উষ্ণ চাঁদরে জড়িয়ে সিকি কড়ি জমানোর তালে তখন প্রকৃতির এক সন্তান মাটিতে পা ছড়িয়ে মাটি ও মানুষের গন্ধ শুকেন।তিনি আকাশের বুকে বিশাল হিমবায়ু ধারন করা বাস্পিভূত এক জলধর।

পায়রার ঢেউ যার কাছে নত স্বীকার করেছে, হেরে গেছে ভাঁজে ভাঁজে ক্ষয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, পান্তার থালা।সবকিছু হারিয়ে জিতে গিয়ে তিনি সেই পায়রার বুকেই অঙ্কন করেছেন শাহিনুর বদির এই অসম প্রেমের হৃদয়ছোঁয়া প্রেমের সমীকরণ।

‘হাঁটতে হাঁটতে একজন মানুষ হয়ে যান ইবনে বতুতা, ভাসতে ভাসতে কলম্বাস, লিখতে লিখতে কেউ একজন রবীন্দ্রনাথ। মূলতঃ ধ্যানমগ্ন না হলে
মাছরাঙাও টপকাতে পারে না আরাধ্য দেয়াল।’

হাঁটতে হাঁটতে একজন মানুষ ইবনে বতুতা হলেও আনোয়ার হোসেন বাদল একজনই।

আনোয়ার হোসেন বাদলের উপন্যাসের কিছু উদ্বৃতাংশঃ

১। মহাবিশ্বের মহাপরিচালক কি মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়েন? নইলে তার রাজ্যে শয়তানের অপশক্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠা পায়? কীভাবে তার সৃষ্টির উপর শয়তান ভর করতে পারে? কালা হাইব্যারাই বা কেনো এতোটা ক্ষমতাবান হন? (অনার্য জীবন)

২। ওটা আমাদের দেশ নয় নিখিল! তুইও মালতিকে নিয়ে চলে আয়। ধর্ম যেখানে মানুষের চেয়ে বড় হয়ে যায় সেখানে মানুষ বসবাস করতে পারেনা।সব দেশেই সংখ্যালঘুদের পূর্ব জনমের পাপ খাঁটতে ভগবান পাঠিয়েছেন নইলে মালতিকে আলাউদ্দিন শিকদারের মত ধার্মিক লোকেরা পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিতে পারে?

আরাধ্যকে আড়ালেই রাখতে, হয় নইলে আরাধ্য সাধন হয়না। (কৃষ্ণপক্ষের আলো)

৩। বাঙ্গালীর এ সমাজ বড় রুঢ়, বড় স্পর্শকাতর। মজ্জাগতভাবে সন্দেহপ্রবণ বাঙালী নারীরা লক্ষ বছর ধরে নিজের মানুষটিকে ধরে রাখার মন্ত্র তারা পিতামহী, মাতামহীদের থেকে বংশ পরম্পরায় পেয়ে থাকেন। সুতরাং নিজের মানুষটির কথা বলার ধরণ, স্বগৃহে পতিদেবের আচরণ ইত্যাদি তারা খুব বিচক্ষণতা দিয়েই যাচাই করে থাকেন। (দৃষ্টিপাত ও দ্বিতীয় গোলক)

৪। পিতা হলেই সবাই বাপজান হয়ে ওঠেন না, তারজন্যে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।(বাপজানের গল্প)

৫। তড়িৎ গতিতে ঘুরে যায় শাহিনুর; বদির হাত ধরে নিজের দিকে ঈষৎ টান মারে, ডান হাত দিয়ে তার মুখে হাত চাপা দেয়। মুর্হুতের মধ্যে শাহিনুরের শরীরের সাথে লেপ্টে যায় বদি, কেঁপে ওঠে। যেন বিদ্যুতের ছােঁয়া লেগেছে তার শরীরে সে কাঁপা হাতে শাহিনুরের ব্লাউজের হুঁক লাগিয়ে দেয়।

মাঝি তুমি একটা নিকম্মার ধারী।(নাটুয়া প্রণয়)।

৬। বিমানের বেশিরভাগ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। আহা!এই অসীম অন্তরীক্ষে বসেও মানুষ ঘুমুচ্ছে। আমার কিন্তু এক ফোটাও ঘুম হচ্ছে না। মনে মনে স্রষ্টাকে ডাকছি-হে প্রভু, হে অন্তর্যামী আমাদের নিরাপদে পৌঁছে দাও।
(ভারতে কয়েকদিন)।

কবিমন কোনো সাধারন ভাবের নয়, লেখক মন কোনো কৃত্রিমতা দিয়ে গড়া নয় তা সমম্পূর্নই ঐশী শক্তির আধারে শক্তিমান।প্রতিনিয়ত তার ভাবের পরিবর্তন হয়।কবির শব্দমালা গুলো নৈঃশব্দ্যে ভ্রমন করে থাকে পুরো সৃষ্টিজগতে।

কবিতায় তার অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য।কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ থাকলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র কবিতা। যা মলাটবদ্ধ করা উচিত বলে মনে করছি।
বনফুল যতই দামী হোক ফুলদানিতে না রাখলে তা বনেই ঝড়ে যায়।