উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে চলতি মৌসুমে আমন ধানের বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো জমির পরিচর্যা, কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং রোগবালাইয়ের তুলনামূলক কম আক্রমণে অধিকাংশ জমিতে ধানের অবস্থা সন্তোষজনক। তবে আগাম তরমুজ চাষের বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে এবার আমন আবাদের জমি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৮৯৬ হেক্টর কমেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে পটুয়াখালী জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৩৪ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩৮ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ জমিতে আমন আবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমির পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ মাঠে আমন ধান পরিপুষ্ট হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও কৃষকরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় এবার ফলন নিয়ে তাদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

বাউফল উপজেলার কৃষক খলিলুর রহমান এবার বিআর-২২ ও বিআর-৫২ জাতের ধান চাষ করেছেন। তিনি জানান, এক একর জমিতে ধান উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এ জমি থেকে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ মণ ধান পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি। বাজারে প্রতি মণ ধান ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে ভালো লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।

একই উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কৃষক দেলোয়ার সিকদার ও আবদুল বারেক হাওলাদার জানান, তারা চার একর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমন ধানের আবাদ করেছেন। সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বিবেচনায় এবার উৎপাদন ভালো হলে লাভবান হওয়ার আশা করছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, চার একর জমি থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মণ ধান পাওয়া যেতে পারে।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার ছোট বিঘাই গ্রামের কৃষক রমজান আলী বলেন, এ বছর আমন আবাদে আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো ছিল। সময়মতো জমির পরিচর্যা করতে পেরেছেন। রোগবালাইয়ের আক্রমণও কম ছিল। ফলে ধানের গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে এবার ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।

তবে ফলন নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। বিশেষ করে ধান কাটার আগে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া কিংবা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে মাঠের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাউফলের আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের বটকাজল গ্রামের কৃষক সোবাহান মীরা জানান, তার এলাকার অধিকাংশ জমিতে ধানের অবস্থা ভালো। তবে চরের কিছু জমিতে আগাম তরমুজ চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমন আবাদ কিছুটা কমেছে।

বাউফল উপজেলা উপকৃষি কর্মকর্তা রেদোয়ান তালুকদার জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ হাজার ৭২০ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৭৯ হেক্টর জমিতে। আগাম তরমুজ চাষের কারণে কিছু জমিতে আমন আবাদ কমেছে। তবে মাঠের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আমানুল ইসলাম জানান, আগাম তরমুজ চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার আমনের আবাদি জমি কিছুটা কমেছে। তবে একই সঙ্গে অন্যান্য মৌসুমি ফসলের চাষও বেড়েছে। জেলায় বিআর-২৩, বিআর-১১, বিআর-২২, বিআর-৫১, বিআর-৪৯ ও বিআর-৫২ জাতের ধানের পাশাপাশি স্থানীয় সাদা মোটা ও লাল মোটা জাতের ধানের আবাদ হয়েছে। স্থানীয় এই দুই জাতের ধান চাষ হয়েছে ৬৫ হাজার ১৬৬ হেক্টর জমিতে।

কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে এবার পটুয়াখালীতে আমনের সন্তোষজনক ফলন পাওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রকৃত উৎপাদনের চিত্র পাওয়া যাবে ধান কাটা ও মাড়াই শেষ হওয়ার পর।

উল্লেখ্য, পটুয়াখালীর অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনে আমন ধানের গুরুত্ব অপরিসীম। এ ফসলের ওপর নির্ভরশীল জেলার বিপুলসংখ্যক কৃষক পরিবার। তাই চলতি মৌসুমে ভালো ফলন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবমুক্ত বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করাও এখন কৃষকদের অন্যতম প্রত্যাশা।