পটুয়াখালীর বাউফলে পল্লী বিদ্যুতের বিল নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অতিরিক্ত বিল, পরিশোধিত পুরোনো বিল পুনরায় যুক্ত করা, একই মাসে একাধিক বিল ইস্যু এবং দীর্ঘদিন আগের বকেয়া বর্তমান বিলের সঙ্গে যোগ করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হলেও বিদ্যুৎ বিল আসছে আগের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ বা তারও বেশি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বিলের অসংগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাচ্ছেন না। এতে সাধারণ গ্রাহকদের বাড়তি আর্থিক চাপের পাশাপাশি বিলের হিসাব নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাউফলের একটি ছ-মিলে প্রায় চার মাস আগে নতুন বিদ্যুৎ মিটার স্থাপন করে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ওই মিলের আগের তিন মাসের জন্য প্রায় ২৫ হাজার টাকার বিল ইস্যু করা হয়। মিলটি অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় বিলের পরিমাণ নিয়ে সন্দেহ হয় মালিক আবু হানিফের।
তিনি বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাঁকে ইস্যু করা বিল পরিশোধ করতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসাব পর্যালোচনা করে নির্ধারিত বিলের চেয়ে প্রায় ৬০০ ইউনিট অতিরিক্ত হিসাব করা হয়েছে বলে জানান। পরে ভুল সংশোধন করে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
নাঈম তালুকদার নামের আরেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে তাঁর বাসার বিদ্যুৎ বিল আসে ৪২০ টাকা। এর সঙ্গে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের ৫৫৭ টাকার একটি বিল যুক্ত করে মোট ৬১৫ টাকার বিল ইস্যু করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ওই বিল আগেই পরিশোধ করা হয়েছিল। পরিশোধের প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার পর তিনি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। পরে তাঁকে ৪২০ টাকা পরিশোধ করতে বলা হয় বলে জানান তিনি।
তাঁর প্রশ্ন, পুরোনো বিল পরিশোধের রসিদ খুঁজে না পেলে তাঁকে কি পুনরায় সেই বিলের অর্থ দিতে হতো? এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বিলিং ব্যবস্থায় গ্রাহকের পরিশোধের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
কামরুল হাসান নামের এক গ্রাহক জানান, ২০২১ সাল থেকে তিনি একটি ভাড়া দোকানে ব্যবসা করছেন। তাঁর অভিযোগ, সম্প্রতি দোকানের বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে ২০১৬ সালের ৫ হাজার ৯০০ টাকার একটি পুরোনো বিল যুক্ত করা হয়েছে।
কামরুলের দাবি, বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাঁকে ওই অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়। অন্যথায় মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথাও বলা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
তিনি আরও দাবি করেন, এ বিষয়ে বাউফল পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপকের (ডিজিএম) কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানালে তিনি পুরো টাকা পরিশোধের কথা বলেন। এ সময় কর্মকর্তার আচরণকে হুমকিমূলক বলে উল্লেখ করেন কামরুল।
জিএম মশিউর রহমান মিলন নামের আরেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, তাঁর বসতবাড়ির একই মিটারের বিপরীতে এক মাসে দুটি বিল ইস্যু করা হয়। তিনি প্রথমে বিল দুটি আলাদা করে যাচাই না করেই পরিশোধ করেন। পরে মিলিয়ে দেখেন, একই বিল দুবার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয়ের আশ্বাস দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, চার মাস পার হলেও সেই সমন্বয় করা হয়নি।
এদিকে মেহেদি হাসান নামের এক গ্রাহকের দাবি, ডিজিটাল মিটার চালুর পর থেকেই বিল নিয়ে সমস্যার ঘটনা বেশি চোখে পড়ছে।
পল্লী বিদ্যুতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাউফল উপজেলায় মোট গ্রাহক ৭৫ হাজার ৩৯ জন। উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ থেকে ২০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ হচ্ছে সাড়ে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের মধ্যেও অনেকের বিল আগের তুলনায় এত বেশি আসছে কেন?
এ বিষয়ে বাউফল পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের ডিজিএম আজিজুল ইসলাম বলেন, অনুমতি ছাড়া তাঁরা বক্তব্য দিতে পারেন না। কোনো বিষয়ে জানার থাকলে লিখিতভাবে জানালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগের জবাব দেওয়া হবে।
পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আবুল কাশেম বলেন, “কোনো বিলে ভুল থাকলে তা সংশোধন করে সঠিক বিল দেওয়ার কথা।” গ্রাহকদের বিলের কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
অতিরিক্ত বিলের অর্থ কোথায় যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভুলবশত অতিরিক্ত বিল হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অর্থ গ্রাহকের নিজস্ব হিসাবে জমা থাকার কথা।” ২০১৬ সালের বিল ২০২৬ সালের অক্টোবরে বর্তমান বিলের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলো, তা নথিপত্র না দেখে বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
জিএম আরও বলেন, “কোনো গ্রাহকের বিল নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তা যাচাই করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গ্রাহকদের দাবি, বিলের প্রতিটি খাত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, পরিশোধিত বিল পুনরায় যুক্ত হওয়া ঠেকানো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে কোনো গ্রাহকের বিলে ভুল পাওয়া গেলে দ্রুত সংশোধন ও অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের এই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।