পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ইলিশ শিকার ও কেনাবেচা অব্যাহত থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্রের সহযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় গোপনে চলছে অবৈধ ইলিশ আহরণ ও বেচাকেনা। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও দালাল ও নির্ধারিত ক্রেতাদের মাধ্যমে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি স্থানে মাছ কেনাবেচার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময় অপরিচিত ক্রেতাদের কাছে সরাসরি মাছ বিক্রি করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন কিছু জেলে। ক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মাছ সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা করা হয় বলে জানা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থানে টাকা জমা রেখে মাছ সংগ্রহের ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে।

মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার সময়ও বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দুর্গম নমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে স্থানীয় একদল জেলে প্রশাসনের ট্রলারকে ধাওয়া করেন এবং হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ একটি দল চিৎকার-চেঁচামেচি করে অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ ঘটনায় অভিযানের নিরাপত্তা ও দুর্গম এলাকায় নজরদারি জোরদারের বিষয়টি সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌর এলাকা-সংলগ্ন রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দির ও বদনাতলীর তেঁতুলিয়া নদীর পয়েন্ট এবং পানপট্টি লঞ্চঘাট-সংলগ্ন আগুনমুখা মোহনায় রাতের আঁধারে ইলিশ শিকার করা হচ্ছে। প্রশাসনের টহল ট্রলার দেখলে কিছু জেলে পাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা, চরবিশ্বাসের চরআগস্তি, জিমতলা, নমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া ও চরবাংলা; রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট; এবং সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, বোয়ালিয়া ও পক্ষিয়া স্লুইসগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে ইলিশ আহরণ ও বেচাকেনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে ভয় পান। তাঁদের অভিযোগ, মাছ ধরতে যাওয়া বা বিক্রির সময় নৌকায় মুঠোফোন বহন না করার বিষয়েও কিছু জেলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ দিনে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ ও বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ করা হয়েছে। এ সময়ে ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, “মৎস্য বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে প্রতিদিন একাধিক যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।”

নমোর স্লুইস এলাকায় অভিযানে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র ডাক-চিৎকার করে হামলার চেষ্টা করেছিল, তবে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।”

মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কার্যকর বাস্তবায়ন, অবৈধ আহরণ বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করতে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।

নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অবৈধ ইলিশের সরবরাহ ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।