পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক, বাজার, আবাসিক এলাকা ও খালে জমছে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও পচনশীল বর্জ্যের স্তূপ, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পলিথিন ও প্লাস্টিক। দুর্গন্ধে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান এবং নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চলছে।
উপজেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নতুন বাজার, পীরতলা বাজার, দুমকী থানার সংযোগ সড়ক, সৃজনী বিদ্যানিকেতন সেতুসংলগ্ন এলাকা এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) পশ্চিম গেটের আশপাশে বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। এসব এলাকার কিছু স্থানে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলে রাখায় পরিবেশ ও চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে নতুন বাজারের পূর্ব প্রান্তে দুমকী-বাউফল মহাসড়ক সংলগ্ন পবিপ্রবির পশ্চিম গেট এলাকায় সড়কের পাশে বর্জ্যের স্তূপ দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আশপাশের বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সেখানে ফেলা হয়। এতে পথচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
একই চিত্র পীরতলা বাজারের পুরোনো থানাপুল সংলগ্ন এলাকায়। সেখানেও জমে থাকা বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। দুমকী থানার সংযোগ সড়ক এবং সৃজনী বিদ্যানিকেতন সেতুসংলগ্ন এলাকাতেও বিভিন্ন স্থানে আবর্জনা জমে থাকতে দেখা গেছে। এসব স্থানে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ পীরতলা খালের বিভিন্ন অংশেও ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, লুথ্যারান হেলথ কেয়ার হাসপাতাল এলাকা থেকে আঙ্গারিয়া পর্যন্ত খালের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য দেখা যায়। বিশেষ করে পীরতলা বাজার ও আশপাশের এলাকার বর্জ্য খালে ফেলার কারণে দূষণের মাত্রা বাড়ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দখল ও ভরাটের কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ ইতোমধ্যে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে বর্জ্য জমতে থাকলে পানি চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং জলাশয়ের পরিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলা সদরে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন এবং নির্দিষ্ট স্থানে অপসারণের নিয়মিত ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান না থাকায় কেউ কেউ সড়কের পাশ, খালি জায়গা ও খালে ময়লা ফেলছেন। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাব ও নিয়মিত তদারকির ঘাটতিকেও এ সমস্যার কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক জসিম উদ্দিন বলেন, “প্রত্যেক বাসায় প্রতিদিন কিছু না কিছু ময়লা তৈরি হয়। কিন্তু সেগুলো ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। ফলে মানুষ যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছেন। বিশেষ করে খালে ময়লা ফেলার প্রবণতা বেশি।”
পীরতলা বাজারের ব্যবসায়ী শাহীন মৃধা বলেন, “মানুষ প্রতিনিয়ত খালে ময়লা ফেলছেন। আবার অনেকে বাড়ির গলির খোলা জায়গায় বর্জ্য রাখছেন। একজনকে দেখে আরেকজন একই কাজ করছেন। এভাবে বিভিন্ন স্থানে ময়লা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।”
পবিপ্রবির শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, “এখানে অনেকেই যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছেন। এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এভাবে বর্জ্য জমে থাকায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের সাধারণ স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন খোলা স্থানে পচনশীল বর্জ্য জমে থাকলে মশা-মাছির বিস্তার, দুর্গন্ধ এবং আশপাশের পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য নালা ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়লেও দূষণের আশঙ্কা থাকে। এ কারণে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দুমকী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর শহীদুল হাসান বলেন, “মেডিকেল বর্জ্য ফেলার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ডাম্পিং স্টেশন তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি যথাযথভাবে কাজে আসছে না। মেডিকেল বর্জ্যও পরিবেশ দূষণের কারণ হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “দুমকী পৌরসভা হলে হয়তো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হতো। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন। দুমকীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে এখন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
দুমকী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন স্থান থেকে এসব বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়। স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ বেশ ব্যয়বহুল। আগে বর্জ্য অপসারণে দূরদর্শী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।”
তবে স্থানীয়দের মতে, মাঝেমধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের ব্যবস্থা ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন। এ জন্য উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা, নিয়মিত অপসারণ এবং খাল-সড়কের পাশে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এতে পরিবেশদূষণ কমার পাশাপাশি দুমকী উপজেলা সদরে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।