দুর্গোৎসব হোক সম্প্রীতির বন্ধন, বাংলাদেশ হোক সবার

সম্পাদকীয় | South BD News 24

আগামীকাল ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গোৎসব। ঢাকের বাদ্য, শিউলির সুবাস আর শরতের স্নিগ্ধতায় মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপগুলো। দেবী দুর্গার আগমনে আনন্দে মাতবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘর, পূজার আলোয় আলোকিত হবে জনপদ। এই উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আনন্দ, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এক অনন্য উপলক্ষ।

আমাদের প্রত্যাশা—দুর্গোৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত কাটুক আনন্দে, প্রতিটি পূজামণ্ডপ থাকুক নিরাপদ, প্রতিটি পরিবার উদ্‌যাপন করুক নির্ভয়ে। কোনো ধর্মীয় পরিচয় যেন কারও আনন্দের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কোনো মা-বাবাকে যেন সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে না হয়। কোনো ভক্ত যেন উপাসনালয়ে যাওয়ার পথে ভয় কিংবা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি না হন। উৎসবের আনন্দ সবার জন্যই হোক সমান, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।

বাংলাদেশ আমাদের সবার—এই সত্যকে ধারণ করেই গড়ে উঠুক সম্প্রীতির বাংলাদেশ।

আমাদের এই ভূখণ্ডের ইতিহাস বহুত্বের, সহাবস্থানের, একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর। বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনধারায় মিশে আছে নানা ধর্ম, নানা বিশ্বাস, নানা সংস্কৃতির সৌন্দর্য। ঈদের আনন্দে যেমন প্রতিবেশীর সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি দুর্গাপূজার আনন্দেও অংশ নেওয়া আমাদের সামাজিক সৌহার্দ্যের পরিচয়। ধর্ম যার যার, কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধ সবার।

একজন মুসলমানের কাছে অন্য ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্বের অংশ। একইভাবে একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীর অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্র এবং সমাজের সম্মিলিত কর্তব্য। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা কখনো যেন মানুষের মধ্যে ঘৃণা, বৈরিতা কিংবা বিভেদের দেয়াল তুলে না দেয়। বরং ভিন্নতার মধ্যেই আমরা খুঁজে নিই সহাবস্থানের সৌন্দর্য।

আমরা মনে করি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শুধু বক্তৃতার বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের আচরণে, প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানোয়, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করার মধ্যে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে প্রতিবাদ জানানোর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রতিরোধ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়া এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল আচরণ করা—এসবই সম্প্রীতি রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

এ দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও কোনো হুমকি, বিশৃঙ্খলা কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের গুরুত্বই হোক বিচারের প্রধান বিবেচ্য।

একই সঙ্গে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে না দেয়। গুজবের আগুন কখনো কখনো বাস্তবের আগুনের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাই দায়িত্বশীল তথ্য প্রকাশ, সত্য যাচাই এবং সংযত ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। গণমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল ঘটনা তুলে ধরা নয়; সত্য প্রকাশের পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করাও তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

একজন প্রকাশক হিসেবে South BD News 24-এর পক্ষ থেকে আমাদের প্রত্যাশা, দুর্গোৎসবের এই শুভক্ষণে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ মানবিকতা ও সহমর্মিতার বন্ধনে আবদ্ধ হোক। সংবাদমাধ্যম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো সম্প্রদায়ের ওপর অন্যায় হলে তার প্রতিবাদ করা, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এলে বিষয়টি দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরা এবং সব মানুষের অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে কথা বলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন হিন্দু নাগরিক নিজের ধর্মীয় উৎসব উদ্‌যাপনের সময় নিজেকে সংখ্যালঘু হিসেবে অসহায় মনে করবেন না; একজন মুসলমান প্রতিবেশীর আনন্দে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারবেন; বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করবেন। যেখানে ধর্মের পরিচয় মানুষের অধিকার নির্ধারণ করবে না, বরং মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের মর্যাদা হবে সমান।

দুর্গোৎসবের আনন্দ যেন পূজামণ্ডপের সীমানায় আটকে না থাকে। সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক পাড়া-মহল্লায়, গ্রাম থেকে শহরে, মানুষের হৃদয় থেকে মানুষের হৃদয়ে। একজনের উৎসব হয়ে উঠুক অন্যজনের শুভকামনার উপলক্ষ। ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যেন কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য না হয়ে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দুর্বল হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ। আর সম্প্রীতি শক্তিশালী হলে সমৃদ্ধ হয় সমাজ, নিরাপদ হয় নাগরিক জীবন, দৃঢ় হয় জাতীয় ঐক্য। তাই দুর্গোৎসবের এই সময়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক—ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা; বিভেদ নয়, ঐক্য; ভয় নয়, নিরাপত্তা; ঘৃণা নয়, মানবতা।

আসুন, দুর্গোৎসবের আনন্দে আমরা সবাই শামিল হই—নিজ নিজ বিশ্বাসের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে।

দেবী দুর্গার আগমনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জীবন আনন্দময় হোক। প্রতিটি পূজামণ্ডপে বাজুক শান্তির ঢাক, প্রতিটি ঘরে থাকুক স্বস্তি, প্রতিটি হৃদয়ে জাগুক মানবতার আলো। কোনো অশুভ শক্তি যেন আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন ছিন্ন করতে না পারে।

শুভ শারদীয় দুর্গোৎসব।

বাংলাদেশ হোক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তি ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—যে দেশে ধর্মের ভিন্নতা নয়, মানুষের পরিচয়ই হবে ভালোবাসা; যে দেশে প্রত্যেক নাগরিক নির্ভয়ে বলতে পারবেন, ‘এই দেশ আমার, এই দেশ আমাদের সবার।’

মীর মোঃ ফরিদ উদ্দিন
প্রকাশক
South BD News 24