শিক্ষার আলো মানুষের মননকে সমৃদ্ধ করে, দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে এবং ভবিষ্যতের পথ দেখায়। অথচ আমাদের সমাজে এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা বিচার করার প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রচলিত কিছু নেতিবাচক ধারণা তাদের সম্ভাবনা ও আত্মবিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। প্রশ্ন জাগে—মাদ্রাসায় পড়াশোনা করলেই কি একজন শিক্ষার্থী আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ে? তার ভবিষ্যৎ কি কেবল ধর্মীয় পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ?
বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীর যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানের নামে নয়, তার জ্ঞান, দক্ষতা, অধ্যবসায় ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়।
ঐতিহ্যের শিকড়ে, আধুনিকতার পথে
উপমহাদেশে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ শিক্ষাধারার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। কালপরিক্রমায় বাংলাদেশেও আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হয়েছে।
এ শিক্ষাব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ সাধারণ শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়নের সুযোগ। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় ঘটানোই হতে পারে এ ধারার অন্যতম শক্তি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান, প্রযুক্তিগত সুবিধা ও ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ সমান নয়। কোথাও রয়েছে অগ্রগতির সম্ভাবনা, কোথাও অবকাঠামো ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ঘাটতি। এসব সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই প্রয়োজন উন্নয়নের কার্যকর উদ্যোগ—কোনো শিক্ষার্থীকে অবজ্ঞা করা নয়।
ভুল ধারণার দেয়াল ভাঙতে হবে
সমাজের একটি অংশ মনে করে, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের সুযোগ সীমিত। এ ধারণা একপেশে। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, সনদের স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্যও উচ্চশিক্ষা ও বিভিন্ন পেশায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষকতা, গবেষণা, সাংবাদিকতা, প্রশাসন, ব্যবসা কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা তাদের সামনে উন্মুক্ত হতে পারে। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে চাই মানসম্মত শিক্ষা, ইংরেজি ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং কর্মমুখী প্রস্তুতি।
কোনো শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়ে বলে তাকে কম যোগ্য ভাবা যেমন অন্যায়, তেমনি বাস্তব দক্ষতার প্রয়োজনকে উপেক্ষা করাও ভুল। পরিচয় নয়, যোগ্যতাই হোক মূল্যায়নের মাপকাঠি।
আত্মবিশ্বাসের আলো জ্বালাতে হবে
একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার আত্মবিশ্বাস। অথচ অবজ্ঞা ও নেতিবাচক মন্তব্য কখনো কখনো তার স্বপ্নের পথে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। যে তরুণের চোখে গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা প্রযুক্তিবিদ হওয়ার স্বপ্ন, তাকে শুরুতেই সীমাবদ্ধতার পরিচয় করিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এখানে দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীর নয়। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত শিক্ষা ও ন্যায্য সুযোগ; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলতে হবে আধুনিক পাঠদান, বিজ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ; আর পরিবার ও সমাজকে হতে হবে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার আশ্রয়।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও এগিয়ে আসতে হবে আত্মপ্রত্যয়ে। পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগৎকে জানতে হবে, নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে, প্রশ্ন করতে শিখতে হবে এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।
ঐতিহ্য হোক শক্তি, সীমাবদ্ধতা নয়
আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার ভবিষ্যৎ কেবল ঐতিহ্যের গৌরবে নয়, সময়ের চাহিদা পূরণের সক্ষমতায় উজ্জ্বল হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করে বিজ্ঞানমনস্ক, প্রযুক্তিবান্ধব ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলাই হওয়া উচিত এ শিক্ষার অগ্রযাত্রার লক্ষ্য।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষার কোনো ধারা অবহেলার জন্য নয়; প্রতিটি ধারার সাফল্য নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের কতটা জ্ঞানী, দক্ষ ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা যাচ্ছে, তার ওপর। তাই আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সম্ভাবনা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ।
আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মানেই পিছিয়ে—এ ধারণা ভাঙুক জ্ঞানের আলোয়, যোগ্যতার প্রমাণে ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। ঐতিহ্য থাকুক শিকড়ে, আধুনিকতা হোক অগ্রযাত্রার শক্তি, আর প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পাক ডানা মেলার অধিকার।
–মীর মোঃ ফরিদ উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি)
কুমারখালী আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসা