বাঁশ

বাঁশ বড়ই নিরীহ ও নিরহংকার একটি উদ্ভিদ। মাঠের ধারে, পুকুরপাড়ে কিংবা বাড়ির আঙিনায় বা আশপাশে, এমনকি কবরের ওপরও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না, কারও কাছে ভোট চায় না, কারও নামে মামলা করে না। অথচ এই না-চাওয়া কাজগুলোর সঙ্গেই মানুষ বাঁশকে এমনভাবে সম্পৃক্ত করেছে যে, এই নিরীহ উদ্ভিদটাকেই সবচেয়ে বেশি বাঁশ দেওয়া হয়! মানুষের জীবনে বাঁশের প্রয়োজনীয়তা এত বেশি যে, পৃথিবীর অনেক মানুষের জীবনী লিখতে গেলে বাঁশকে আলাদা একটি অধ্যায় দিতে হবে। নইলে বাঁশ নিয়ে হাসফাঁস করতে করতে নিজেরই বাঁশ খেতে হবে।

বাঁশ দিয়ে ঘর হয়, বেড়া হয়, মাচা হয়, কুলা হয়, ডালা হয়, ঝুড়ি হয়। বাঁশ দিয়ে বাঁশি হয়—যে বাঁশি বিষণ্ন সন্ধ্যাতেও মানুষের মনকে আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারে। আবার সেই বাঁশই লাঠি হয়ে কারও মাথায় পড়লে আনন্দের বদলে ‘হায় গুরু!’ শুরু হয়ে যায়। একসময় গুরুর ছাত্র নামক গবেট বা গরুকে মানুষ করতে বেত কিংবা বাঁশের কঞ্চির প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য ছিল।

বাঁশের সবচেয়ে বড় গুণ হলো—সে নিজেকে নিয়ে গর্ব-অগর্ব কিছুই করে না। লম্বা লম্বা কঞ্চি ও পাতা নিয়ে বাতাসে দোলে। অথচ তাকে কত বিতর্কের মধ্যে ফেলে মানুষ! তাকে দিয়ে মহৎ থেকে অমহৎ—সব ধরনের কাজই করিয়ে নেয়। তারপর বদনামটাও তার ঘাড়েই চাপিয়ে দেয়। বলে—‘শালার বাঁশ!’

আপনি যদি সরল মনেও কাউকে বলেন, ‘তাকে একটা বাঁশ দাও’, সে আপনার মুখে ফুল-চন্দন দেওয়ার পরিবর্তে বিষ ঢেলে দিতে পারে। কারণ বাংলা ভাষায় ‘বাঁশ’ এখন আর শুধু একটি উদ্ভিদের নাম নয়; এটি মানুষের সামাজিক অভিধানের একটি শক্তিশালী শব্দ।

বাঁশ দিয়ে কৃষক ধানের মাচা বানান, জেলে মাছ ধরার সরঞ্জাম বানান, গৃহস্থ ঘর-বেড়া দেন। কারিগর বাঁশ দিয়ে চমৎকার শিল্পকর্ম তৈরি করেন। শিল্পী বাঁশি বানিয়ে সুর তোলেন। অর্থাৎ বাঁশ মানুষের সভ্যতার এক নীরব শ্রমিক।

তবুও বাঁশ কেন যে আমাদের জীবনে দীর্ঘশ্বাস হয়ে উঠল, তা আজও আমার বোধগম্য নয়। কারণ এই নীরব শ্রমিকের আরেকটি পরিচয়—‘বাঁশ’।

বাঁশ নিয়ে ট্রল-মিথ কীভাবে তৈরি হলো জানি না। তবে আগের দিনে রাতে চিঠি ও টাকার বোঝা কাঁধে নিয়ে পোস্ট অফিসের রানাররা এক পোস্ট অফিস থেকে আরেক পোস্ট অফিসে হেঁটে যেতেন। সেই রানারের হাতে নিরাপত্তার জন্য থাকত একটি বাঁশের লাঠি, আর বাঁশের মাথায় থাকত একটি হারিকেন। দূর থেকে দেখলে মনে হতো, লোকটির পশ্চাৎদেশ দিয়ে বুঝি একটি লম্বা বাম্বু বা বাঁশ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে!

তাই বুঝি রানারের দুঃখ-দুর্দশার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে মানুষ বলত—‘সোগায় বাঁশ, হাতে হেরিকেন।’

পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট এখনো বোধহয় সেই লোগো ব্যবহার করে চলছে!

তবে এই দুই সহোদর সহযাত্রীর মধ্যে হারিকেন মানুষের ব্যবহারিক জীবন ও মনন থেকে প্রায় হারিয়ে গেলেও বাঁশ আছে মহা দোর্দণ্ড প্রতাপে। অর্থাৎ জীবন-বাস্তবতায় বাঁশকে ভুলে গেলে চলবে না।

কাউকে বাঁশ দেওয়া হয়েছে—এ কথা শুনলে এখন আর কেউ বাঁশঝাড় খুঁজতে যায় না। সবাই বুঝে যায়, লোকটির কপালে কিছু একটা ঘটেছে!

বাঁশ এখানে আর উদ্ভিদ নয়; এটি ফেতনা, ভর্ৎসনা, সামাজিক দর্শন—সবকিছুর এক অদ্ভুত সমন্বয়।

কারও সঙ্গে একটু বেশি চালাকি করলে সে আপনাকে বাঁশ দিতে পারে। আবার আপনি যদি তার চেয়েও বেশি চালাক হন, তাহলে তাকেও বাঁশ দিতে পারেন। আবার কিছু অতী চালাক লোক নিজের সোগায়ও নিজে বাঁশ দিতে পারে। এভাবে এক বাঁশ থেকে আরেক বাঁশের জন্ম হয়। কখনো কখনো দেখা যায়, পুরো সমাজই যেন বাঁশঝাড়ে পরিণত হয়েছে—কেউ বাঁশ দিচ্ছে, কেউ বাঁশ খাচ্ছে, আর কেউ দূরে দাঁড়িয়ে বাঁশের বাজারদর দেখছে!

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, বাঁশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে কোনো বৈষম্য নেই। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছোট-বড়—সবার জন্য বাঁশ সমানভাবে উন্মুক্ত। তবে বাঁশের আকার ও মানে কিছু পার্থক্য আছে। কেউ পান চিকন বাঁশ, কেউ মোটা বাঁশ; কেউ একবারে, কেউ কিস্তিতে।

কখনো কখনো মানুষ এমন জায়গায় বাঁশ দেয়, যেখানে বাঁশ দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আবার এমন জায়গাতেও বাঁশ দেওয়া হয়, যেখানে একটু সহযোগিতা করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। আমাদের এই অভ্যাস দেখে স্বয়ং বাঁশও হয়তো লজ্জা পায়! কিন্তু বেচারার কিছুই করার নেই।

বাঁশের আরেকটি অসাধারণ গুণ হলো—এটি বাঁকতে জানে। ঝড় এলে বাঁশ ঝুঁকে পড়ে, কিন্তু ঝড় চলে গেলে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃতি থেকে মানুষের শেখার মতো চমৎকার শিক্ষা এটি।

কিন্তু মানুষ বাঁশের এই গুণটি পুরোপুরি শিখতে পারেনি। মানুষের অশিক্ষা-কুশিক্ষা বাঁশকে আরও চরম বিতর্ক ও বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে। মানুষ অনেক সময় সামান্য বাতাসেই এমনভাবে বাঁকে যে, পরে তাকে সোজা করতে ক্রেন লাগলেও কাজ হয় না। অথচ বাঁশের কাছ থেকে জীবনের এই সহজ শিক্ষাটুকু নেওয়ার কথা তাদের মাথায় আসে না।

আবার বাঁশঝাড়েরও একটি দর্শন আছে। একা একটি বাঁশ যতটা শক্তিশালী, অনেক বাঁশ একসঙ্গে দাঁড়ালে তার শক্তি আরও বেশি। মানুষও যদি তেমনভাবে একসঙ্গে দাঁড়াতে পারত, তাহলে অনেক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া যেত।

কিন্তু আমরা প্রায়ই একে অন্যকে বাঁশ দেওয়ার কাজে এত সিদ্ধ হস্ত ব্যস্ত থাকি যে, একসঙ্গে দাঁড়ানোর সময়ই পাই না।

এখানে হয় মানুষ ব্যর্থ, নয় বাঁশ; নয়তো উভয়ই—কারও শিক্ষা-দীক্ষায়, বোঝাপড়ায় রেসিপ্রোকাল হতে পারেনি!

তবে বাঁশকে পুরোপুরি দোষ দেওয়া অন্যায়। বাঁশ কাউকে নিজে থেকে বাঁশ দেয় না। মানুষই বাঁশকে হাতে তুলে নেয়। মানুষই তাকে লাঠি বানায়, মানুষই তাকে অস্ত্র বানায়, মানুষই তাকে দিয়ে অন্যকে শিক্ষা দিতে যায়।

অথচ সেই একই বাঁশ দিয়ে একজন শিল্পী বাঁশি বানিয়ে এমন সুর তুলতে পারেন, যে সুরে মানুষের চোখে জল আসে।

সুতরাং বাঁশের কোনো দোষ নেই। দোষ আমাদের ব্যবহারে।

একই বাঁশ দিয়ে কারও ঘর বানানো যায়, আবার কারও ঘর ভাঙাও যায়। একই বাঁশ দিয়ে বাঁশি বাজানো যায়, আবার মাথাও ফাটানো যায়। একই বাঁশ দিয়ে মাচা বানিয়ে কাউকে ওপরে তোলা যায়, আবার লাঠি বানিয়ে কাউকে নিচে নামিয়েও দেওয়া যায়।

তাই বাঁশকে দেখে আমাদের অন্তত একটি শিক্ষা নেওয়া উচিত—উপকরণ কখনো ভালো বা খারাপ হয় না; মানুষের ব্যবহারই তাকে ভালো অথবা খারাপ করে তোলে।

আর একটা কথা মনে রাখা ভালো—বাঁশঝাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশ অন্তত কাউকে বাঁশ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে না। সে চুপচাপ বাতাসে দোলে।

মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে বাঁশ না থাকলেও বাঁশ দিতে পারে!

এই জায়গাতেই মানুষ বাঁশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

সুতরাং বাঁশের সর্ববিধ ব্যবহার অনস্বীকার্য। উহা অতীতে যেমন ছিল, ভবিষ্যতেও তেমন থাকবে। জন্ম থেকে মৃত্যু, দোলনা থেকে কবর—বাঁশ আপনার লাগবেই।

আপনি কথায় কথায় আজীবন মানুষের পশ্চাৎদেশে বাঁশ, বাম্বু দিলেও বাঁশ আপনাকেও ছাড়বে না।

বেশি বাড়াবাড়ি করলে আপনার কবরের ওপর আপনার বুক ফুঁড়ে জেগে উঠে বাঁশ হয়তো বলবে—

‘সারাজীবন যেখানে-সেখানে বাঁশ দিয়ে বেড়িয়েছিস! আজ তোর বুকের ওপর জেঁকে বসলাম। থাক এই বাঁশঝাড়ের নিচে। নাহলে ঢুকে পড়ব শেকড়সহ তোর গোয়ার পিছে!’

অতএব, সাবধান!

বাঁশকে এতো অবহেলা বা হেলাফেলা কোরো না। তার প্রখর স্মৃতিশক্তি নিয়ে সে কিন্তু তোমার কবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে জানে!