নদীভাঙনে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের ১৮৩ নং পশ্চিম চরকাজল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বিলীন হওয়ার হুমকিতে রয়েছে। বিদ্যালয় ভবন থেকে মাত্র ১৫০ ফুট দূরে এসে ঠেকেছে বুড়াগৌরাঙ্গ নদী। ভাঙন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বিদ্যালয়টি। ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম চরকাজল বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় আহম্মেদ আবু জাফরের দান করা ৪০ শতাংশ জমিতে তার উদ্যোগেই ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দানকৃত জমি নদীগর্ভে বিলীন হলে তিনি আবারও জমি দান করেন। রেজিস্ট্রেশনভুক্ত পশ্চিম চরকাজল প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে দুই শিফটে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম চলছে। প্রাক-প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণিতে পড়ছে ১০৫ জন শিক্ষার্থী।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বুড়াগৌরাঙ্গের ভাঙনে পশ্চিম চরকাজল মৌজা পুরোপুরি এবং বড় চরকাজল মৌজার একাংশ ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে একটি মাদ্রাসা, চারটি মসজিদ ও একটি কমিউনিটি বিদ্যালয়ের ভবনসহ শতাধিক বসতবাড়ি ও ফসলী জমি নদীতে চলে গেছে। ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয় ভবনটিও রক্ষা করা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা মসজিদ, মাদ্রাসা ও বসতবাড়িও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাহিরুল ইসলাম বলেন, “ভাঙনস্থল স্কুল থেকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ফুট দূরে রয়েছে। তবে স্কুল সংলগ্ন বেড়িবাঁধটির ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এটিই এলাকার মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। এটি ভেঙ্গে গেলে একই সঙ্গে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ একর চাষাবাদযোগ্য জমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “স্থানীয়ভাবে আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ দিয়ে বেড়িবাঁধ তৈরি করে রাস্তাটি রক্ষার চেষ্টা করছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি।”

অভিভাবক আল-আমিন গাজী জানান, “আমার সন্তান প্রতিদিন এই স্কুলে যায়। কিন্তু যখন দেখি নদী স্কুলের কাছাকাছি তখন ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। এই স্কুল হারালে আমার সন্তানের মতো শত শত শিশু কোথায় পড়বে? আমরা গরিব মানুষ, দূরে গিয়ে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। এই স্কুলটাই ওদের একমাত্র ভরসা। সরকার যদি এখনই ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা না করে, তাহলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।”

বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাশিদা বেগম বলেন, “আগে নদী অনেক দূরে ছিল। কিন্তু নদীভাঙনের ফলে দিনে দিনে খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। শিগগিরই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বিদ্যালয়ের ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে ছোট বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।”

চরকাজল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “নদীভাঙন রোধে আমরা প্রতিমন্ত্রী নুরুল হকের কাছে আবেদন করেছি। ভাঙন ঠেকাতে ব্লক স্থাপনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডেও আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, “নদীভাঙন রোধে আমরা জিওব্যাগ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তবে বর্তমানে ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। এরপরও বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমরা জিওব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করছি।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইজাজুল হক বলেন, “বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তিনি আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। এরপর পরিস্থিতি দেখে আমরা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেব। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গেও আমি কথা বলেছি। নদীভাঙন রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”