কেবল আশপাশের দু-একটি বাসা-বাড়ির বর্জ্যই নয়, পুরো পটুয়াখালীর গলাচিপা পৌর শহরের যাবতীয় পচা ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত এনে ফেলা হচ্ছে বাসাবাড়ির একদম মুখে। পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ‘১৩০ ব্র্যাক আবাসন প্রকল্প’ এলাকাটি এখন যেন পুরো পৌর শহরের এক উন্মুক্ত ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত ও সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পের একেবারে গা ঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে শহরের বর্জ্য ডাম্পিং করার কারণে চরম নরকযন্ত্রণা পোহাচ্ছেন এলাকার হাজারো মানুষ। তীব্র তাপে পচা ময়লার বিষাক্ত দুর্গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, আর বর্ষার বৃষ্টিতে ময়লা পচে সুপেয় পানির উৎস ও যাতায়াতের পথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আবাসন প্রকল্পের ঠিক পাশেই জমে উঠেছে পর্বতসম পচা আবর্জনার স্তূপ। দিন-রাত এক করে ট্রাক ও ভ্যান থেকে একের পর এক পৌরসভার ময়লা ফেলা হচ্ছে। মাছি ও মশার ঝাঁক এবং কুচকুচে কালো পচা পানি গড়িয়ে নেমে আসছে এলাকার একমাত্র চলাচলের রাস্তার ওপর। স্থানীয় মানুষ ও কোমলমতি শিশুরা নাকে রুমাল বা হাত চেপে চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছে।
আবাসন এলাকার এক বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ বলেই কি আমাদের মানুষের মর্যাদা নেই? শুধু আশপাশের না, পুরো গলাচিপা পৌরসভার যত ময়লা-আবর্জনা আছে, সব এনে আমাদের ঘরের সামনে ফেলা হচ্ছে! নাকে কাপড় না দিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়ানো যায় না। পচা দুর্গন্ধের কারণে শান্তিতে এক লোকমা ভাত পর্যন্ত মুখে তোলার উপায় নেই।”
একই ক্ষোভ প্রকাশ করেন এলাকার এক ভুক্তভোগী নারী। তিনি বলেন, “পৌরসভার গাড়ি এসে প্রতিদিন এখানে ময়লা ফেলে যায়। একটু বৃষ্টি হলেই পচা ময়লার বিষাক্ত পানি এসে আমাদের ঘরের ভেতর ঢোকার অবস্থা। আমাদের ছোট ছোট বাচ্চারা সব সময় জ্বর, ডায়রিয়া আর চর্মরোগে ভুগছে। আমরা পৌরসভার লোক ও সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদের বহুবার বলেছি, কিন্তু কেউই আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।”
খোলা স্থানে পুরো একটি পৌর শহরের বর্জ্য এভাবে ডাম্পিং করায় দেখা দিয়েছে তীব্র পরিবেশ দূষণ। পচা ময়লা-আবর্জনায় জমাটবদ্ধ পানিতে জন্ম নিচ্ছে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বাহক মশা। মাছি ও মশার উপদ্রবে এলাকায় অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রামক রোগব্যাধি।
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, গলাচিপা পৌর শহরের ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য বর্তমানে যে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক এলাকার কাছে বর্জ্য ডাম্পিং করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। পচা বর্জ্যের বাতাস থেকে বাসিন্দারা অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টে ভুগতে পারেন। পাশাপাশি মশা ও মাছির মাধ্যমে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, চর্মরোগ এবং ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য প্রাণঘাতী।
তিনি আরও জানান, যতটুকু জানা গেছে—পৌরসভার পক্ষ থেকে ময়লা ডাম্পিং নিয়ে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেই মহাপরিকল্পনায় যেন ডাম্পিং স্টেশনটি লোকালয় ও শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে তৈরি করা হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমানে ব্যবহৃত এই স্থান থেকে যাতে পানিবাহিত ও বায়ুবাহিত রোগ নতুন করে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি। সাময়িক সুরক্ষার জন্য তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের ফুটানো পানি পান করা, মাস্ক ব্যবহার ও রাতে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি পৌরবাসীকে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন থাকা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।
এলাকাবাসীর এখন একটাই জোর দাবি—কোনো সাময়িক আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতির খেলা নয়, অবিলম্বে এই বিষাক্ত ময়লার ভাগাড় ব্র্যাক আবাসন এলাকা থেকে সরিয়ে একটি নির্দিষ্ট ও পরিবেশবান্ধব স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড গড়ে তোলা হোক।