বর্ষা মানেই বাংলাদেশের প্রাণ। এই ঋতুর নামেই তো আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ, বঙ্গের দেশ, পানির দেশ। কিন্তু যখন সেই পানিই হয়ে ওঠে অভিশাপ, যখন আকাশের অনুগ্রহ পরিণত হয় নগরীর দুর্দশায়, তখন প্রশ্ন জাগে কোথায় আমরা ভুল করছি? এখন এই জুলাইয়ে ঢাকা আবার সেই চিরচেনা দৃশ্যের সাক্ষী হলো। মাত্র কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে শহরের ১০৩টি স্পট তলিয়ে গেল হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস বন্ধ, গণপরিবহন স্থবির, লাখ লাখ মানুষের দিনভরের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল এসব যেন নিত্যনৈমিত্তিক খবরে পরিণত হয়েছে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর শুধুমাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক ও ত্রিপোলি ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থানে। কিন্তু এই নিরাশার মেঘের আড়ালেও এক নতুন সূর্যের উদয় ঘটছে। দেশনায়ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় খাল খনন অভিযান ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের মহামিশন। পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা ব্যারেজ, নতুন ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান এসব শব্দমালার মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি সমৃদ্ধ, জলজটমুক্ত, স্বপ্নের ঢাকার স্বপ্নকথা। এই প্রতিবেদনটি কেবল একটি সমস্যার বিশ্লেষণ নয়, এটি একটি সমাধানের রূপকল্প। এই বিশ্লেষণে আমরা দেখবো কীভাবে দেশনায়কের নেতৃত্বে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, সমন্বিত ও টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। এই লেখাটি কেবল তথ্যের সমাহার নয়, এটি একটি আবেগের গান এই মাটি, এই পানি, এই মানুষের প্রেমের গান। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, বর্ষা মানেই হবে প্রকৃতির আশীর্বাদ, অভিশাপ নয়। আর সেই স্বপ্নের পথেই এগিয়ে চলছে নতুন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম।

বাসযোগ্যতায় তলানিতে ঢাকা: ইআইইউর লজ্জাজনক র‍্যাঙ্কিং : যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে ঢাকা বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ১৭১তম স্থানে অর্থাৎ তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর। শুধুমাত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপোলি ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থানে। ১০০-এর মধ্যে ঢাকার স্কোর ৪২, যেখানে শিক্ষায় ৬৭, স্থিতিশীলতায় ৪৫, স্বাস্থ্যসেবায় ৪২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪১ এবং অবকাঠামোয় মাত্র ২৭, এই অবকাঠামো স্কোরই বলে দেয় সড়ক যোগাযোগ, গণপরিবহন, আবাসন, পানি ও জ্বালানি সেবায় ঢাকার নাগরিকরা কী না ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ: খাল-বিল ভরাটের ফল :
ঢাকা মূলত নদী-খালকেন্দ্রিক শহর ছিল। একসময় পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি প্রাকৃতিক। কিন্তু দশকের পর দশক খাল ও জলাশয় ভরাট করে ঢাকার বিভিন্ন অংশ গড়ে উঠেছে। দখল ও দূষণে নদীগুলোও সরু হয়ে গেছে। এই প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়ার ফলাফল আজ ভুগছে নগরবাসী। বিচ্ছিন্নভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা, কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ গেছে ময়লা-আবর্জনায় ভরা খালের নোংরা পানি আর ঠিকাদারদের পকেটে।

দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন দিগন্ত : ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকারের নেতৃত্বে দেশনায়ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে ক্ষমতা গ্রহণের পর ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে শুরু হয়েছে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে nationwide canal excavation programme উদ্বোধন করেছেন ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ, দিনাজপুরের কহারোলে। এই কর্মসূচির অধীনে আগামী পাঁচ বছরে ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন মাসেই ৯০০ কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে।

জাতীয় খাল খনন মহামিশন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় খাল খনন অভিযান। ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের এই মহামিশন কেবল কৃষিজমির সেচ নয়, ঢাকার মতো শহরের পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করবে। মার্চ ২০২৬ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে ১,২০৪ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যা অর্জিত হয়েছে।

পদ্মা ব্যারেজ: পানির সুরক্ষার মহাদুর্গ : ৩৪৪.৯৭ বিলিয়ন টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুকনো মৌসুমে কৃষি ও নগরীর চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের এই প্রকল্প দেশের জিডিপিতে ০.৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে।

তিস্তা ব্যারেজ: উত্তরাঞ্চলের পানির নিরাপত্তা : প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে তিস্তা ব্যারেজ মাস্টার প্ল্যান যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়িত হবে। উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের দীর্ঘদিনের এই চাহিদা পূরণে সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি জলনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনে নতুন যুগের সূচনা করবে।

ঢাকা ওয়াসা ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান ২০১৬-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন : ওয়াসার ২০১৬ সালের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানকে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে যাচাই-বাছাই করে শতভাগ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্ল্যানের সুষ্ঠু বাস্তবায়নে দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে কাজ চলছে।

সিটি করপোরেশনে স্বতন্ত্র ড্রেনেজ বিভাগ : দুই সিটি করপোরেশনে পানি নিষ্কাশনের জন্য স্বতন্ত্র ড্রেনেজ বিভাগ ও দক্ষ কারিগরি জনবল কাঠামো অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পেশাদার টিম দিয়ে জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞানভিত্তিক করা হবে।

নতুন পাম্পিং স্টেশন স্থাপন : ঢাকা নগরীতে প্রয়োজনমাফিক নতুন পাম্পিং স্টেশন দ্রুত স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতাপ্রবণ ১০৩টি স্পটে অতিরিক্ত পাম্প স্থাপন করা হবে।

ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ : বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে ছোট-বড় পয়োনিষ্কাশনের নালা, বক্স কালভার্ট ভালোভাবে পরিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাবি ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা পরিদর্শন করে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম দুটি ফগার মেশিন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

খাল-বিল উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার : অবৈধভাবে ভরাট হওয়া জলাশয়গুলো উদ্ধারে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বর্ষা শেষে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি খাল খনন করা হবে এবং পানি নিষ্কাশনের পথগুলো পুনরুদ্ধার করা হবে।

পলিথিন ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা : হাজার হাজার পলিথিন ও বালিশ পর্যন্ত ড্রেনে ফেলে রাখার যে চিত্র দেখা গেছে, তা রোধে জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ড্রেন যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য এলাকাবাসীর সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণ : ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কোথায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি, তা জরিপের মাধ্যমে চিহ্নিত করে লার্ভা জন্মাতে না পেরে সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে।

পানি সরানোর পুনর্বিন্যাস : ধানমন্ডি, নিউমার্কেটসহ এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য বিজিবির ভেতর দিয়ে নতুন পথ তৈরির প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে এক থেকে দুই বছর সময় লাগবে।

দক্ষিণাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন : ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলের পানি বুড়িগঙ্গা কিংবা শীতলক্ষ্যায় ফেলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নদীর নাব্যতা ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি : ঢাকার চারপাশের নদনদীর নাব্যতা ও ধারণক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত খননকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ ও দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হবে।

পয়োবর্জ্য ও বৃষ্টির পানির লাইন আলাদা করা : পয়োবর্জ্য আর বৃষ্টির পানির লাইন আলাদা করার প্রযুক্তিগত সমাধান খোঁজার কাজ চলছে। এতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার চাপ কমে আসবে এবং জলাবদ্ধতা অনেকটা লাঘব হবে।

নাগরিক অংশীদারিত্ব ও সমন্বয় : সিটি করপোরেশনকে ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ড ধরে বিশ্লেষণ করে সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বে এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বের উন্নত দেশের দৃষ্টান্ত: আমস্টারডাম, টোকিও, সিঙ্গাপুর : আমস্টারডাম যে শহর সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত, সেখানকার পানি ব্যবস্থাপনা বিশ্বসেরা। ডাচরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পানির সাথে লড়াই করে এক বিজ্ঞানভিত্তিক মডেল তৈরি করেছে। টোকিওর আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনেজ সিস্টেম “গায়কান” বিশ্বের অন্যতম আধুনিক পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যা ঘণ্টায় ২০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি সামলাতে পারে। সিঙ্গাপুরের “এবিসি ওয়াটারস” প্রোগ্রাম শহরের প্রতিটি ফোঁটা পানিকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে, যেখানে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারের এক চমৎকার মডেল তৈরি হয়েছে।

পরিশেষে, ঢাকা শুধু একটি শহর নয় এটি আমাদের স্বপ্নের, আশার, ভালোবাসার নগরী। প্রতিটি বর্ষায় যখন এই শহর তলিয়ে যায়, তখন শুধু রাস্তাঘাট নয়, তলিয়ে যায় আমাদের স্বপ্নও। কিন্তু দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ নতুন এক সূর্যোদয় ঘটছে। পদ্মার বুকে ব্যারেজ, তিস্তার তীরে নতুন স্বপ্ন, ২০,০০০ কিলোমিটার খালের পানির ধারায় ফিরে আসবে গ্রামবাংলার প্রাণ। এই পানি, এই মাটি, এই মানুষ তিনের মিলনেই তো বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে শুরু হওয়া এই মহামিশন কেবল জলাবদ্ধতার সমাধান নয়, এটি একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নরূপকল্প। যে বাংলাদেশে বর্ষা মানে হবে প্রকৃতির আশীর্বাদ, অভিশাপ নয়। যে বাংলাদেশে প্রতিটি শিশু বর্ষায় স্কুলে যেতে পারবে, প্রতিটি বাবা-মা অফিসে যেতে পারবেন নিশ্চিন্তে। এই বর্ষা হয়তো শেষ পর্যন্ত দুর্ভোগেরই নাম ছিল। কিন্তু জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই পানি ব্যবস্থাপনার মহাবিপ্লবের ফল ইনশাআল্লাহ আগামী কয়েক বছরেই দেখা যাবে।

লেখক : জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট