নৌপথে যাত্রীসেবা বাড়াতে ১৯৮৪ সালে পটুয়াখালীর লোহালিয়া নদীতীরে লঞ্চ টার্মিনাল স্থাপন করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। স্থাপনের পর টার্মিনালটি বেশ কয়েকবার সংস্কারও করা হয়েছে। তবে বর্তমানে নদীতে নাব্যতা সংকটে কার্যত সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে টার্মিনালটি। চারটি পন্টুনের দুটির সামনে প্রায় ২০০ ফুট এলাকাজুড়ে চর জমে যাওয়ায় সেখানে লঞ্চ নোঙর করা বন্ধ রয়েছে। ফলে একসঙ্গে একাধিক লঞ্চ ভিড়লে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। টার্মিনাল এলাকায় সারা বছর দুটি ড্রেজার মেশিন অবস্থান করলেও পন্টুন-সংলগ্ন নদীপথে চর জমে লঞ্চ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে যাত্রী নিরাপত্তা ও নৌযান চলাচল উভয়ই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নাব্য সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না।

যাত্রীরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালকের কার্যালয় যে ভবনে অবস্থিত, তার সামনেই নদীর নাব্যতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। নদীতে ড্রেজার থাকলেও পন্টুন-সংলগ্ন চ্যানেল নিয়মিতভাবে কাটা হচ্ছে—এমন কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। বর্তমানে দুটি পন্টুনে সীমিতভাবে লঞ্চ নোঙর করা সম্ভব হলেও একসঙ্গে পাঁচ-আটটি লঞ্চ এলে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা-পটুয়াখালী রুটের লঞ্চ চরে আটকে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ঘাট এলাকায় একটি বড় লঞ্চ নোঙর করলেই অন্যান্য লঞ্চ নদীর মাঝখানে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা যাত্রী ওঠানামাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইন্তাজ খান বলেন, “দুটো ড্রেজার সারা বছর চোখের সামনে পড়ে থাকে, কিন্তু কাজের কোনো বাস্তব ফল দেখা যায় না। লঞ্চ বেশি এলে ঘাটে ঢুকতে গিয়ে চরে আটকে পড়ে। ড্রেজিংয়ের নামে এখানে লোক দেখানো কার্যক্রম চলছে বলেই মনে হয়। আগে একটি ড্রেজার দিয়েই পন্টুন এলাকা পরিষ্কার রাখা যেত, এখন দুটি ড্রেজার থেকেও সে ফল মিলছে না। এটা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারই ইঙ্গিত।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী সাত্তার জানান, “আগে এখানে ১০-১৫টি লঞ্চ ভিড়ত। এখন একটি লঞ্চ ঘোরানোই কঠিন হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার একই এলাকায় অবস্থান করলেও কাঙ্ক্ষিতভাবে নাব্য ফিরে আসছে না।”

পূবালী-১২ লঞ্চের মাস্টার মো. শুকুর আলী বলেন, “নিয়মিত ড্রেজিং না করায় ভাটার সময় লঞ্চ চরে আটকে যায়। এখানে একসঙ্গে কয়েকটি লঞ্চ এলেই ঘোরানো কঠিন হয়ে পড়ে।”

নদীতে পলি জমা স্বাভাবিক হলেও তা মোকাবেলায় ধারাবাহিক ও ফলপ্রসূ ড্রেজিং নিশ্চিত না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ পটুয়াখালীর সহকারী পরিচালক জাকির শাহরিয়ার বলেন, “ড্রেজিং-সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এ বিষয়ে আমার দায়ভার নেই। পন্টুন এলাকায় নদীর তলদেশে মাটি জমা হওয়া একটি চলমান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করতে হয়। অতিরিক্ত লঞ্চ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় নাব্যতা নিশ্চিত করতে রক্ষণাবেক্ষণমূলক ড্রেজিং করা হবে।”

তবে ওই কর্মকর্তার এমন বক্তব্য দায়িত্ব এড়ানোর ইঙ্গিত বলে মনে করেন সচেতন নগরিকরা। কারণ টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, যাত্রী নিরাপত্তা ও নৌযান নোঙরের উপযোগিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর ওপরই বর্তায়। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে নাব্য সংকট অব্যাহত থাকায় কার্যকর তদারকি ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ড্রেজার উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যদি পন্টুন-সংলগ্ন চ্যানেল ব্যবহারযোগ্য না থাকে, তবে তা কেবল প্রাকৃতিক কারণ নয়; বরং ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও নজরদারির ঘাটতির প্রতিফলন হতে পারে। নাব্যতা পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে নৌ-দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।