আমার পরিবারের দু’জন মুক্তিযোদ্ধা। একজন ছোটমামা আব্দুল আলী আজাদী, দ্বিতীয়জন ফুফাতো ভাই সুবেদার মিনহাজ হাওলাদার।
একাত্তরের পঁচিশে মার্চে মিনহাজ ভাই পিলখানায় ছিলেন। ঐ রাতে পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য স্থানে নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঘুমন্ত অবস্থায় পাক হায়েনার দল অতর্কিতে হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হ^ত্যা করে। আমার ফুফাতো ভাই অগ্রজ বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুবেদার (অবঃ) মিনহাজ সদর দফতর পিলখানায় কর্মরত ছিলেন, আমার ছোট মামা বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদী ছিলেন বরিশাল বিএম কলেজে। ছোটমামা ছাত্র ইউনিয়ন করতেন।
পঁচিশে মার্চের রাতে ফুফাত ভাই তৎকালীন নায়েক মিনহাজ হাওলাদারের সাথে একই ব্যারাকে সর্বমোট ছত্রিশজন সৈনিক ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। গুলির শব্দে তারা সবাই দিশে হারা হয়ে পড়েন এবং গুলিতে তাঁর সহযোদ্ধা কয়েকজন সৈনিক শাহাদাত বরণ করেন।
আমার ভাই মিনহাজ ও তার সহযোদ্ধারা দ্রুত অস্ত্রহাতে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও হানাদার বাহিনীর উপুর্যুপরি গুলি ও বোমাবর্ষণে তারা পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তারা গাজীপুরে সংগঠিত হন এবং দীর্ঘ ন’মাস সমুখ সমরে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেন। মিনহাজ বেঁচে আছেন কী মারা গেছেন তা জানার জন্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমার বাবা ও অন্যান্য ফুফাতো ভাইরা নানাভাবে খবর নিতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সবাই ধরেই নিয়েছিলেন যে, মিনহাজ আর বেঁচে নেই। আমার সেই ভাই সুবেদার (অবঃ) মিনহাজ এবং আমার ছোটমামা এ জাতির সূর্যসন্তান।
তাঁদের দু’জনের সাথেই আমার রক্তের বন্ধন। ছোটমামা পরবর্তীতে গ্রামে ফিরে এসে তাঁর মামাবাড়ি বাকেরগঞ্জের ভরপাশা, পাঙ্গাশিয়া, মৌকরণ ও ইটবাড়িয়া এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং নেতৃত্ব দেন। আমার সেই মামা এবং ফুফাতো ভাই আজ বেঁচে নেই কিন্তু তাঁদের প্রতিবাদী, আপোষহীন রক্ত বইছে আমার এবং আমার পরবর্তী উত্তরসূরীদের ধমনীতে। তাঁরাই আমাদের দিয়ে গেছেন এই স্বাধীন ভূখণ্ড আজ শুয়ে আছেন মাটির গহব্বরে। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
আসলে প্রতিবাদ আমার রক্তের ধারা। তাঁরা যেমন ১৯৭১ এ সমুখ সমরে ছিলেন তেমনি অর্জিত স্বাধীনতাকে যারা বাপের সম্পত্তি করে রেখেছিলো, যারা গণতন্ত্র হত্যা করে মানুষের অধিকার হরণ করেছিলো যারা দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেরা মাফিয়া সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলো তাদের বিরুদ্ধেও দু’জন মানুষই আজীবন কথা বলেছেন। আমি নিজেও যখন বুঝতে পেরেছিলাম যে ১৯৭০ সালের বঙ্গবন্ধু আর ক্ষমতার বঙ্গবন্ধু এক নয়, যখন বুঝতে পেরেছিলাম যে, তার কন্যাও স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ভুলে গেছেন তখন থেকে আমি একজন লেখক হিসেবে আমার দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম জারি রেখেছি। গত জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি অংশ নিয়েছি। অংশ নিয়েছি নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও। প্রকৃতঅর্থে বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাসের বাঁকপরিবর্তনের প্রতিটি পর্বে মুক্তিকামী মানুষের সকল কর্মযজ্ঞে আমি ও আমার পরিবার দেশের পক্ষে ছিলো এটা আনন্দের বিষয়।
আজ সেই ভয়াল কালরাত এবং আগামীকাল ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। ৫ আগস্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির কুলাঙ্গারের মধ্যে একাত্তরকে অস্বীকার করার প্রবনতা দেখেছি। মনে রাখতে হবে বাঙালির ইতিহাসে একাত্তরের স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। একাত্তর এদেশের জন্মপরিচয়।
আজ এক্ষণে শুধু এটুকুই বলবো যে, যেই সুমহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তারই স্পিরিটে গড়ে উঠুক সোনার বাংলা। ভবিষ্যতে আর কোন গোষ্ঠি যেন মুক্তিযুদ্ধকে তার বাপের অর্জন বা দেশকে তার পৈত্রিক সম্পত্তি মনে না করে অথবা রাজাকারদের মত কেউ যেন মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে সে জন্যে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
আজকের এই দিনে আমার মামা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আলী আজাদী ও ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার (অবঃ) মিনহাজসহ সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, প্রয়াত ও জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
লেখকঃ কবি ও কথাসাহিত্যিক
আনোয়ার হোসেন বাদল