আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, চাইলেই ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না।
ইতিহাস হাড়্ডিলার মতোই অমর— তাকে ইচ্ছেমতো বিকৃত করাও যায় না। বিকৃতি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ইতিহাস দিকদর্শন যন্ত্রের মতোই শেষ পর্যন্ত তার সঠিক স্থানে এসে স্থির হয়।
ইতিহাসকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা কিংবা অযথা অতিরঞ্জন—কোনোটিই ঠিক নয়। এসবের মাশুল এ জাতিকে বহুবার দিতে হয়েছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিভ্রান্তির ঘূর্ণিপাকে ঘুরেছে। সরকার পরিবর্তন হলেই ইতিহাস পাল্টে যায়—এমন প্রবণতা আমরা বহুবার দেখেছি। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস কখনো পাল্টানো যায় না; শত চেষ্টা করেও কেউ কোনোদিন তা পারেনি।
যদি ইতিহাস সত্যিই পাল্টানো যেত, তবে ১৭৫৭ সালে মুর্শিদাবাদের রাস্তায় মৃত সিরাজউদ্দৌলার লাশের ওপর উল্লসিত জনতার থুথু নিক্ষেপের ঘটনা ইতিহাসে থাকত না। অথচ আড়াইশ বছর পরে সেই সিরাজউদ্দৌলাই আজ ইতিহাসের মহানায়ক। আজও মানুষ মুর্শিদাবাদে গিয়ে মীর জাফরের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দেয়, থুথু নিক্ষেপ করে। সেই স্থানটির নামও মানুষ দিয়েছে—“নিমকহারামের দেউড়ি”। আবার ভাগীরথী পার হয়ে খোশবাগে সিরাজউদ্দৌলার কবরের কাছে গিয়ে মানুষ অঝোরে কাঁদে।
পুরো মুর্শিদাবাদ ঘুরেও এমন কাউকে পাওয়া যাবে না, যে গর্বভরে বলবে—“আমি মীর জাফরের বংশধর।” অথচ কেউ যদি সিরাজউদ্দৌলার বংশধর হন, সমাজে তার সম্মান কতখানি—তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমাদের দেশেও এর ভিন্ন চিত্র নেই। গত উল্লাসিত সময়ের মধ্যেও যারা পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছে, জিন্নাহর জন্মোৎসব করেছে, তারাও বুক ফুলিয়ে বলতে পারেনি—“আমরা গর্বিত রাজাকার।”
অনেক উৎকণ্ঠা ও সংগ্রামের পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাই এখনই সময়—ইতিহাসে যার যতটুকু প্রাপ্য, তাকে ততটুকুই সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার।
শিক্ষা যেমন একটি জাতির মেরুদণ্ড, তেমনি ইতিহাসও একটি জাতির পথনির্দেশক শক্তি।
মাসুদ আলম বাবুল
অধ্যক্ষ, কবি ও কথাসাহিত্যিক