শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এ কথা সবাই জানে। কিন্তু সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যা শিক্ষা কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী। সরকারের সাম্প্রতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত সেই ধরনেরই এক আত্মঘাতী পদক্ষেপ, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একীভূতকরণ কেন অগ্রহণযোগ্য

দেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নিজে নিজে গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে সরকারের অনুমতি, নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে। অতএব, আজ যদি সরকার মনে করে এসব প্রতিষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়, তবে সেটি কেবল এক প্রজন্মের নয়—পুরো সমাজের প্রতি অবিচার হবে।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা ও মানোন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ, যেসব উদ্যোক্তা ও এলাকাবাসী নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ, চাঁদা, অনুদান ও জমি দিয়ে লক্ষ লক্ষ—কখনও কোটি টাকাও ব্যয় করে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তাদের অপরাধ কী? কিংবা সংশ্লিষ্ট এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদেরই বা অপরাধ কোথায়?

এই প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখা এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক কর্তব্য ও নৈতিক দায়িত্ব।

সমান সুযোগ ও মান নিশ্চিত করা জরুরি

প্রথমত, দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার মান প্রায় সমপর্যায়ে থাকে।

দেশে বেতনবিহীন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকবে না—এ নীতিটি কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ভবন, শিক্ষা উপকরণ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্বও সরকারকেই নিতে হবে।

ভর্তি নীতির পুনর্গঠন প্রয়োজন

সরকারি ও নামী (ব্র্যান্ডেড) কলেজগুলোর ভর্তি-আসনের সংখ্যা পুনর্গঠন করতে হবে। অতিরিক্ত আসন প্রদান বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের কোনো সরকারি কলেজে জিপিএ ৪-০০-এর নিচে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে না—এ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

প্রতিবছর উপজেলা ভিত্তিক পাসের সংখ্যা অনুযায়ী ভর্তি-আসন সমন্বয় করতে হবে, যাতে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান ন্যায্যভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে এবং সক্রিয়ভাবে টিকে থাকতে পারে।

প্রস্তাবিত আসন বিন্যাস

সরকারি কলেজে ভর্তি আসন নিম্নরূপ নির্ধারণ করা যেতে পারে—

মানবিক বিভাগে: ১৫০ জন

বিজ্ঞান বিভাগে: ১০০ জন

ব্যবসায় শিক্ষা ও অন্যান্য বিভাগে: ৫০ জন

অন্যদিকে বেসরকারি কলেজের ক্ষেত্রে—

মানবিক বিভাগে: ১০০ জন

বিজ্ঞান বিভাগে: ৫০ জন

ব্যবসায় শিক্ষা ও অন্যান্য বিভাগে: ৩০–৪০ জন

এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা কার্যকর হলে দেশের অচল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সচল হবে, শিক্ষার মান বাড়বে, এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

উপসংহার

একীভূতকরণ নয়—প্রয়োজন বৈচিত্র্যের মধ্যে সাম্য।
প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্বতা, ঐতিহ্য ও সামাজিক ভূমিকা রক্ষা করেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব। সরকারের উচিত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারণ করা, যাতে শিক্ষা হয় সবার জন্য সমান সুযোগের এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তে জ্ঞানের আলো পৌঁছে যায়।

মাসুদ আলম বাবুল
অধ্যক্ষ, কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।