‘খাওন তো দূরের কতা, আমি মরলে মাটি দেওয়ার মানুষ নাই। এক সময় বয়স ছিলো এখন বুড়া হইয়া গেছি। আগের মতো শক্তি নাই। বাড়ি দিয়া হাইট্টা দোকানে আসতেও কষ্ট হয়। কিন্তু কী করমু? দোকানে না আইলে যে একবেলাও খাওন জোটে না। আমি আর পারি না।” কথাগুলো বলছিলেন গলাচিপা সদর ইউনিয়নের পক্ষিয়া গ্রামের পক্ষিয়া স্লুইজ গেটের চায়ের দোকানী বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া জয়নব বিবি।
দারিদ্র্যের নির্মম থাবায় জীবন এখন সংগ্রামের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে গলাচিপা সদর ইউনিয়নের পক্ষিয়া গ্রামের জয়নব বিবির। তার সত্তরোর্ধ স্বামী সত্তার বিশ্বাস বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগলেও জীবিকার তাগিদে এখন কাজ করতে না পারলেও স্ত্রী জয়নবের সাথে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ হেঁটে পৌঁছান স্লুইজ গেটের কাছে তাদের ছোট্ট চায়ের দোকানে সময় দেন। কারণ এটাই তাদের জীবনের একমাত্র উপার্জনের পথ। হাটতে না পেরে অন্য পথচারিদের উপর ভরসা করে বাজার থেকে দোকানের পণ্য কিনে আনান তিনি। ছেলে মেয়ে না থাকায় দারিদ্রের এ নির্মমতা মেনে নিয়ে শুধু বেঁচে থাকার জন্যই চায়ের দোকানে বসা। কয়েক মাস আগে স্বামী সাত্তার বিশ্বাস অসুস্থ হয়ে পরলে এলাকার মানুষের কাছে চেয়ে চিন্তে টাকা তুলে চিকিৎসা করিয়েছেন। এখন ওষুধ কিনে খাওয়ার সম্বলটুকুও তাদের আর নেই।
জয়নব বিবি বলেন, প্রতিদিন একশ থেকে দেড়শ টাকার মতো বিক্রি হয়। এই সামান্য টাকাতেই দোকানের মালামাল কিনে দিনে নিজেরা খরচ করতে পারেন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টাকা। এই টাকায় দু’জনের খাবার, ওষুধ কিংবা প্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা তো দূরের কথা, কোনো দিন ভালো খাবারও জোটে না তাদের।
তিনি আরো বলেন, “সবচেয়ে কষ্টের বিষয় আমারে দেহার মতো কোনো ছেলে-মেয়ে নাই। নিজের হাতে গড়ে তোলা সংসার আজ নিঃসন্তান, নিঃস্ব, অসহায়। এমনকি মৃত্যুর পর দাফন করার মতো আপনজনও থাকবে না”- কথা বলতে গিয়ে জয়নব বিবির কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে জয়নবের।
এসব কষ্টের কথা ওই গ্রামের সকলেরই জানা। তাই তার দোকানে এসে এলাকার মানুষ দামের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে চা-বিস্কুট খেয়ে যায় যাতে তাদের একটু হলেও সহযোগিতা করা যায়।
পক্ষিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গণি মোল্লা (৭০) বলেন, আমার জানা মতে এই গ্রামের এদের চেয়ে অসহায় মানুষ আর নাই। আমার সাধ্যমতো মাঝে মাঝে তাদের সাহায্য সহযোগিতা করি। কিন্তু এতেও তাদের সংসার চলেনা।
পক্ষিয়া স্লুইজ গেটের দোকানী নেছার উদ্দিন খান (৪৭) বলেন, “অনেক সময় জয়নব বিবির দোকানে বসে কাজ করতে কষ্ট হয়। স্বামীও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় দোকানের কাজ সামলাতে হিমশিম খান। তবুও মানবিক সহায়তার আশায় তাকিয়ে আছেন তারা। উনি যে দোকানে আছেন দোকানটি আমার পরিত্যাক্ত অবস্থায় ছিলো। স্থানীয় ইউপি বা কোথাও থেকে কোন সহায়তা না পাওয়ায় আমি তাকে সহায়তা করার জন্য দোকনটি দিয়ে দিয়েছি। এতে যদি অসহায় মানুষ দুটি বেচা কেনা করে খেয়ে পরে থাকতে পারে।”
তিনি আরো বলেন, “এক সময়ের স্বপ্নভরা সংসার আজ টিকে আছে শুধুই সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার ওপর। এই অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির শেষ বয়সের দিনগুলো কিছুটা হলেও স্বস্তির হতে পারে, যদি স্থানীয় প্রশাসন, সমাজের স্বচ্ছল ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা মানবিক উদ্যোগে এগিয়ে আসা মানুষজন একটু সহায়তার হাত বাড়ালে তাদের কস্টের কিছুটা লাঘব হতে পারে।”
জালাল আহমেদ, পটুয়াখালীঃ 














